ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৯, ২৩:৩১

প্রিন্ট

সামুদ্রিক শৈবালে নতুন সম্ভাবনা

সামুদ্রিক শৈবালে নতুন সম্ভাবনা
কক্সবাজার প্রতিনিধি

কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সীউইড বা সামুদ্রিক শৈবালের চাষ নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। বিনিয়োগের ঝুঁকি না থাকায় সমুদ্র উপকূলের মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস হতে পারে এ শৈবাল। কক্সবাজারসহ দেশের ৭১০ কিলোমিটার-ব্যাপী সমুদ্র সৈকত এবং ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার-ব্যাপী উপকূলীয় অঞ্চল সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজি চাষের উপযোগী। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে ১১৭ প্রজাতির সী-উইড শনাক্ত হলেও এরমধ্যে ১০টি রপ্তানীযোগ্য ও বাণিজ্যিকভিত্তিতে লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সোমবার দুপুরে কক্সবাজার সাগরপাড়ের এক হোটেলে কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কক্সবাজার উপকূলে সী-উইড চাষ সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র সম্পর্কিত অর্থনীতি জোরদার করার জন্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগানোর আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট মৎস্য বিজ্ঞানী ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ।

তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যদি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করা না হয়, তাহলে সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কোন মানে থাকে না। আমাদের সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সমুদ্রসীমা বিজয়ের ফসল ঘরে তুলতে হবে। আমাদের দেশে খাবার হিসেবে এর জনপ্রিয়তা না থাকলেও বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা ও বাজার মূল্য রয়েছে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।’

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মহিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ভাষায় সী-উইড ‘হেজালা’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট এর কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র ২০১৩ সাল হতে সী-উইড নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইন্সটিটিউট থেকে কক্সবাজার সদর উপজেলার বাঁকখালী নদী-মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় নুনিয়ারছড়া থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত সৈকত সংলগ্ন জোয়ার-ভাটা এলাকা ও মহেশখালী দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন সী-উইডের প্রাকৃতিক উৎপাদন ক্ষেত্রের সন্ধান লাভ করেছে। প্রাপ্যতা ও স্থানীয় পরিবেশের সাথে মানানসই প্রজাতিগুলোর পুষ্টিমান যাচাই এবং খাদ্য উপাদান হিসেবে বাণিজ্যিক গুরুত্বের আলোকে গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। ইন্সটিটিউট এর বিজ্ঞানীরা কক্সবাজার উপকূলে এ পর্যন্ত ১১৭ প্রজাতির সীউইড সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সে সাথে সীউইডের পুষ্টিমান নির্ণয় করা হয়েছে। পুষ্টি মানের বিচারে বিভিন্ন দেশে খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও এটি সমাদৃত। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরী, ঔষধ, টেক্সটাইল ও কাগজ শিল্পে সী-উইড আগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া জমিতে সার হিসাবে, প্রাণী খাদ্য ও লবণ উৎপাদনেও সী-উইড ব্যবহার করা হয়। সী-উইডে প্রচুর পরিমাণে খনিজ দ্রব্য বিদ্যমান থাকায় খাদ্যে অণূপুষ্টি হিসেবে এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এসব সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজিসমূহে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামসহ মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও আয়োডিন-জনিত গলগন্ডরোগের কার্যকরী প্রতিষেধক হিসাবে বিবেচিত বলে জানান বিজ্ঞানীরা। রক্তে কোলেস্টরেল কমাতেও সী-উইডের অনন্য ভূমিকার কথা জানানো হয়। এতে সামুদ্রিক লবণের চেয়ে অধিক পরিমাণে আয়োডিন রয়েছে বলে থাইরয়েড (গলগণ্ড) রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও এটি কাজ করে।

কর্মশালায় বিজ্ঞানীরা গবেষণা লব্ধ ফলাফল তুলে ধরে আরো জানান, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ইনানী ও শহরতলীর বাঁকখালী মোহনার আশপাশের পাথুরে ও প্যারাবন এলাকায় জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থানেই অধিকাংশ সী-উইড জন্মায়। তবে সী-উইড জন্মানোর জন্য কিছু ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত বড় পাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক-পলিকিটের খোসা, প্যারাবনের গাছ-শিকড়, শক্ত মাটি কিংবা অন্য যেকোনো শক্ত বস্তুর উপর সী-উইড জন্মে বলে জানান বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশে সী-উইডের বৃদ্ধির হার ভারতের চেয়ে বেশি। তবে ভারতে বছরে ২১০ দিন চাষ করা গেলেও বাংলাদেশে মাত্র বছরে ৯০ দিনই চাষ করা যায়।

বিজ্ঞানীরা জানান, আমাদের জলবায়ুতে স্থানভেদে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস সী-উইড চাষ করা যায়। তবে চাষের সর্বোচ্চ অনুকূল অবস্থা বিদ্যমান থাকে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাস সময়। নারিকেলের রশি ও নাইলনের মাছ ধরার জাল ব্যবহার করে ইন্সটিটিউট থেকে আনুভূমিক নেট পদ্ধতিতে সী-উইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ড. জাহেদুর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রামস্থ সামুদ্রিক মৎস্য জরীপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. লতিফুর রহমান, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষণা শাখার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কাঁকড়া বিশেষজ্ঞ ড. ইনামুল হক এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রফেসর ড. হারুনুর রশীদ। আরো বক্তব্য দেন, কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোহাম্মদ শরিফউদ্দিন। কর্মশালা পরিচালনায় ছিলেন উপ-পরিচালক ড. আবদুর রাজ্জাক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকিয়া খানম। কর্মশালায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ছাত্র, এনজিও কর্মী, সাংবাদিক ও উদ্যোক্তাসহ শতাধিক অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত