সাইপ্রাসে বাংলাদেশি তরুণ হত্যায় গ্রেপ্তার এক স্বদেশি
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ১২:৫৩

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের লারনাকা শহরে কাজে যোগ দিতে বের হওয়ার ১০ দিন পর শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২) নামের বাংলাদেশি এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। গত রোববার লারনাকা শহরের কোফিনু এলাকার একটি স্থানে মাটিচাপা দেওয়া তাঁর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১১ জুন রাত নয়টার পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিখোঁজ হওয়ার রাত থেকে গত রোববার লাশ উদ্ধারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত শাহরিয়ারের মুঠোফোন ব্যবহার করে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে বাবা নাসির মিয়ার কাছে ৩৫ হাজার ইউরো (প্রায় ৫০ লাখ টাকা) মুক্তিপণ চেয়ে আসছিলেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা।
নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে শাহরিয়ার সবার বড়। তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে গিয়েছিলেন তিনি। সাইপ্রাসের লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন।
শাহরিয়ার আহমেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার শাহীন বাবু (২২) নামের বাংলাদেশি এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে সাইপ্রাস পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহরিয়ারের মাটিচাপা দেওয়া লাশ ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের বরাতে জানিয়েছেন স্বজনেরা। তবে গ্রেপ্তার হওয়া শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
সাইপ্রাস পুলিশের বরাত দিয়ে নিহত তরুণের স্বজনেরা বলেন, ‘‘নিখোঁজ হওয়ার রাতেই শাহরিয়ারকে হত্যা করা হয়। ছুরিকাঘাতে হত্যার পর লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনার তদন্তে নেমে শাহরিয়ারের মুঠোফোনটি পুলিশ উদ্ধার করে ওই তরুণের কাছ থেকে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।’’
শাহরিয়ারের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিন মাস আগে রোজার শেষ দিকে তিনি শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে যান। দেশে অবস্থানকালে অনলাইনে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর খরচ হিসেবে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাঠাতে হতো। তাই বাড়ি থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করতে তিনি একটি চাকরি খুঁজছিলেন।
১১ জুন বিকেলে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় শাহরিয়ারের। তিনি মাকে বলেন, “আজকে একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। নাইট ডিউটি। আজ রাতেই জয়েন। দোয়া কইরো।” চাকরি পাওয়ার বিষয়টি তিনি গ্রিসপ্রবাসী বাবা নাসির মিয়া এবং সাইপ্রাসে থাকা রুমমেট রায়হান মিয়াকেও জানান।
রায়হান তাঁকে কাজের স্থানে পৌঁছে লোকেশন পাঠাতে বলেছিলেন। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে শাহরিয়ার কাজের স্থানে পৌঁছে হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠান। কিন্তু এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, “আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তাঁর চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব।”
পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বিষয়টিকে হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনা মনে করেছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে শাহরিয়ার কাজে থেকেও ফেরেননি। এরপর রুমমেট রায়হান স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পুলিশ লোকেশন অনুসরণ করেও তাঁকে খুঁজে পায়নি।
এদিকে প্রতিদিনই শাহরিয়ারের নম্বর থেকে যোগাযোগ করে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হচ্ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষি করে পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল। রোববার টাকা পাঠানোর প্রস্তুতিকালে তাঁরা একবার শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও অপরপক্ষ তাতে রাজি হয়নি।
নিহতের ভাই নয়ন আহমেদ বলেন, “ব্যাংক থেকে ফিরে আসি। রাত আটটার দিকে ফেসবুকে দেখি, সাইপ্রাস পুলিশ শাহরিয়ারের লাশ উদ্ধার করেছে। সাইপ্রাসে থাকা পরিচিতরাও একই খবর জানান।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহরিয়ারের মা পাপিয়া বেগম বলেন, “আমার ছেলেরে যারা মারছে, তাদের বিচার চাই। আপনারা ছেলের লাশটা দেশে আইন্যা দেন, আমি একবারের জন্য ছুঁয়ে দেখব।”
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, “সাইপ্রাসে পড়তে যাওয়া রায়পুরার শাহরিয়ার নামের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়েছি। তবে বিষয়টি সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এ পর্যন্ত আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তারা সহযোগিতা চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সূত্র: প্রথম আলো
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










