ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ২২:১৩

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯

‘আমার সন্তান ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে। ওকে বের করব কীভাবে?’ কথাগুলো বলছিলেন বাবা ইয়ামিলেথ জিমেনেজ। লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাদের সাততলা ভবনটি ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পের পর জীবিতদের খোঁজে উদ্ধারকাজ চলছে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ১৯ বছর বয়সী ছেলের চিন্তায় জিমেনেজ এখন দিশাহারা।

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প হয় স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায়—পরপর দুবার। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধসে পড়ে বহু ভবন। শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮৯ জনে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, এই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

মৃত্যু নিয়ে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। সরকারের পক্ষ থেকে আনুমানিক কত মানুষ নিহত হতে পারেন, সে তথ্য দেওয়া না হলেও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা একটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৬০০ জনের নাম যুক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এই ভূমিকম্পের প্রভাব ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষের ওপর পড়তে পারে।

এরই মধ্যে নিহতের হালনাগাদ তথ্য জানান ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। তার ভাষ্যমতে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ৫৮৯ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ২ হাজার ৯৮০ জন আহত হয়েছেন। আর সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২৫০টি ভবন ধ্বংস বা বিধ্বস্ত হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটটি হাসপাতাল, রেডক্রস ভবন ও ফরাসি দূতাবাস ভবন রয়েছে।

আধুনিককালের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এবারের ভূমিকম্পকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে দেশটিতে সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন ২৪০ জন নিহত হয়েছিলেন। এবারের ভূমিকম্পের পর কারাকাসের সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার বলেন, ‘জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, পুরো ভবন আমার ওপর ভেঙে পড়বে।’

ভূমিকম্পের পর গত বৃহস্পতিবার রাতেও অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শোনা গেছে। তাদের উদ্ধারে মাঠে নেমেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, সেনাসদস্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ। অনেককে খালি হাতেই উদ্ধারকাজ করতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক জায়গায় মশাল জ্বালিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে মানুষজনকে।

উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা হুয়ান অর্তিজ বিবিসিকে বলেন, তার একজন বন্ধু মারা গেছেন। আরেক বন্ধু ধ্বংসস্তূপের নিচে। তার পরিচিত প্রায় ২০ জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কারাকাস মহানগরের অধীন পৌরসভা ‘চাকাও’-এর মেয়র গুস্তাভো দুকে বলেন, উদ্ধারকর্মীদের আশা, অনেকে জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন। যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনেক মানুষ আবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। এমনই একজন উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার বাসিন্দা পেদ্রো পেরেজ। ভূমিকম্পে তার বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাস্তায় বসবাস করছেন ৬৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উপকূলীয় মোরন শহরের চিত্রও একই। সেখানে বিদ্যুৎ-পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এসব শহরের অসহায় মানুষজনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে স্বেচ্ছাসেবীদের। লা গুয়ারায় খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। রয়টার্সের সাংবাদিকেরা ‘কোলেকতিভো’ নামে সরকারপন্থী মোটরসাইকেল দলের সদস্যদেরও উদ্ধারকাজে নামতে দেখেছেন। অন্য সময় তাঁরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরক্ত করতেই ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই দুর্যোগের মধ্যে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, মেক্সিকো, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর ও কাতার। উদ্ধারকাজে সহায়তায় পরিবহন জাহাজ, উড়োজাহাজ, উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। এরই মধ্যে সহায়তার জন্য মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর সদস্যরা কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্প ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সহায়তা ও মানবিক ত্রাণ পাঠাচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিনবিরোধী প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে দেশটি থেকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তারপর দায়িত্ব নেওয়া ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করেছেন। সহায়তার আশ্বাস পেয়ে গতকাল ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন দেলসি।

সহায়তার বিষয়ে জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর কাজ সমন্বয় করছে জাতিসংঘ। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমন্বিতভাবে বড় ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হবে। কারণ, ভূমিকম্পের আগেই দেশটিতে টালমাটাল অবস্থার কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত