ঢাকা, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ৭ মিনিট আগে
শিরোনাম

ইস্কান্দার–জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিয়েভে ভয়াবহ হামলা রাশিয়ার

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ২৩:০২

ইস্কান্দার–জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিয়েভে ভয়াবহ হামলা রাশিয়ার
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। যুদ্ধ শুরুর পর কিয়েভে এটি ছিল সবচেয়ে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলোর একটি। এতে অন্তত একজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন। হামলায় শহরের বিভিন্ন স্থাপনা আগুন ধরে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

শনিবার(১৮ জুলাই) দিবাগত রাত দেড়টায় শুরু হয়ে আজ রোববার সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টা ধরে এ হামলা চলে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, কিয়েভে প্রায় ৪০টি ইস্কান্দার-এম এবং হাইপারসনিক জিরকন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া। রাত দেড়টার দিকে বাসিন্দারা বিমান হামলার সতর্কসংকেত (সাইরেন) শুনতে পান। প্রথমে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শব্দ শোনা যায়। কয়েক মিনিট পরই পরপর কয়েকটি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে। এতে কিয়েভের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলের বাড়িঘরগুলো কেঁপে ওঠে। রাস্তায় থাকা গাড়িগুলোর অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে। সকাল সাড়ে ছয়টায় দ্বিতীয়বারের মতো সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। এ সময় আরও হামলার খবর পাওয়া যায়।

শেভচেঙ্কিভস্কি জেলার মধ্যাঞ্চলে একটি তিনতলা ভবনে আগুন ধরে যায়। উদ্ধারকর্মীরা সেখানে আটকে পড়া কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। সেখান থেকে একজনের লাশও উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আরও চারটি এলাকায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবন, কার্যালয় ও একটি ছাত্রাবাসে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।

বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ধাক্কায় লুকিয়ানিভস্কা মেট্রোস্টেশনের নিচতলার প্রবেশপথের ছাদ ধসে পড়ে। স্টেশনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বাসিন্দারা অনলাইনে এর ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেন। মেট্রোস্টেশনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কিয়েভের সামরিক প্রশাসন বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে জানায়, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলায় দুঃখজনকভাবে একজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানান, হামলায় সাতজন আহত হয়েছেন।

কিয়েভের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের রাজধানী। তবে তারা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ছোড়া ১২৫টি ড্রোনের মধ্যে ১০৮টিই ধ্বংস করেছে তারা।

২০২২ সালে ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। এর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কিয়েভসহ ইউক্রেনের অন্যান্য শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে রুশ বাহিনী।

কিয়েভের পশ্চিমাংশের একটি জায়গায় বোমা হামলার শিকার অ্যাপার্টমেন্টের আগুন নেভাতে দেখা যায় জরুরি পরিষেবার কর্মীদের। এ সময় তাঁরা ধোঁয়া ওঠা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন।

ভ্লাদ নামের এক বাসিন্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, বিস্ফোরণের সময় তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টেই ছিলেন। প্রচণ্ড শব্দে বারান্দার দরজা ভেঙে তাঁর মাথায় এসে পড়ে। তিনি বলেন, ‘দাদি আমার সঙ্গে থাকেন। তিনি হাঁটতে পারেন না। তাঁকে ফেলে আমি কীভাবে পালাব?’

রাশিয়ার হামলার সলোমিয়ানস্কি, দেসনিয়ানস্কি ও দিনিপ্রো জেলাতেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানেও ছুটে যান।

‘আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি’

গত সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ‘প্যাট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টর তৈরির লাইসেন্স পেতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেন একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এর উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মূলত ইউক্রেনের নিজস্ব ইন্টারসেপ্টরের (ক্ষেপণাস্ত্র–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র) মজুত এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।

সর্বাত্মক এ যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে রাশিয়ার হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে কিয়েভকে দ্রুত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করতে বিদেশি মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ছে।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জেলেনস্কি বলেন, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিজেদের রক্ষা করাই এখন আমাদের সব সময়ের ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিনই ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন।’

এদিকে কিয়েভে বর্তমানে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। দেশের জনপ্রিয় ও আধুনিক চিন্তাধারার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে বরখাস্ত করার জেরে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। এরই মধ্যে রাশিয়ার এ হামলার ঘটনা ঘটল। বিক্ষোভকারীরা ফেদোরভকে স্বপদে বহাল করার দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সোভিয়েত আমলের মানসিকতা সম্পন্ন সেনাপ্রধান কর্নেল জেনারেল ওলেকসান্দর সিরস্কিকে বরখাস্ত করার দাবি তুলেছেন।

শুধু ইউক্রেনেই নয়, রাশিয়ায়ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মস্কো ও তামবভ অঞ্চলে ই-কমার্স গুদাম ধ্বংস করতে আক্রমণকারী ড্রোন পাঠায় ইউক্রেন। এতে আটজন নিহত হন এবং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।

জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের শহর, জনপদ ও বেসামরিক অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলার জবাবে মস্কো ও তামবভ অঞ্চলে দুটি বড় লজিস্টিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, ড্রোন তৈরি ও নেভিগেশন সরঞ্জামের জন্য নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিভিন্ন উপাদান সরবরাহে ওই কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা হতো।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলের পর ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস ছিল গত জুন। ওই মাসে অন্তত ২৯৩ জন নিহত হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এ সংঘাত অবসানের আলোচনা এখন পুরোপুরি থমকে আছে। অন্যদিকে সম্মুখ রণাঙ্গনেও লড়াই একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত