ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭ আপডেট : ৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২০, ১৬:২৩

প্রিন্ট

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বঞ্চনার সমাপ্তি কবে?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বঞ্চনার সমাপ্তি কবে?
আবু ফারুক

বাংলাদেশের সরকারি চাকরির জগতে সবচেয়ে বড় পরিবার ‘প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ’। ১৫ লাখেরও বেশি সরকারি পেশাজীবীর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কর্মরত। ৬৫ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষকের তিন লাখই সহকারী শিক্ষক। দেশের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত বা মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের মূল চালিকাশক্তি এসব সহকারী শিক্ষক অনেক অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার শিকার। তবুও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন ত্বরান্বিত করতে আন্তরিকতা ও সর্বোচ্চ চেষ্টার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। পাঠদানের বাইরেও শিশুজরিপ, আদমশুমারি, ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করা, ভোট গ্রহণ, কৃষিশুমারি, উপবৃত্তির তালিকা প্রস্তুত করাসহ নানা ধরনের কাজের সব দায়িত্ব শতভাগ সততা ও দক্ষতার সমন্বয়ে সম্পাদন করার ক্ষেত্রেও সহকারী শিক্ষকদের ভূমিকা বারবার প্রমাণিত। কিন্তু এত কিছুর পরেও, তারা বেতনবৈষম্যের শিকার। বঞ্চিত ‘পদোন্নতি’র প্রাপ্য অধিকার থেকেও! সবচেয়ে বড় কথা, তারা এখনও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী!

‘পদোন্নতি’ প্রতিটি পেশাজীবীর কর্মস্পৃহা যেমন বাড়ায় তেমনি অভিজ্ঞ কর্মীর দক্ষতা ও বিচক্ষণতায় সমৃদ্ধ হয় সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদে ৬৫ ভাগ সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতির কথা থাকলেও আদালতে মামলা থাকায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে যোগদান করে সেই পদের তকমা নিয়েই যেতে হয় অবসরে, যার প্রভাবে মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ডও। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সাল থেকে প্রায় ১৮ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দিলেও তা এখনও স্থায়ী পদোন্নতির সনদ পায়নি। তাই বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতির সুযোগ নেই বলাই শ্রেয়। অন্যান্য বিভাগে নিচের পদ থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চাকরির বয়স, অভিজ্ঞতা বা বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এটি তাদের উচ্চারিত দাবি আর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।

পদোন্নতি বঞ্চনার পাশাপাশি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সর্বশেষ খসড়া নিয়োগবিধিতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে প্রধান শিক্ষকদের সুযোগ বহাল রেখে সহকারী শিক্ষকদের সুযোগ বাদ দেওয়া হচ্ছে। নন-ক্যাডার কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা মোতাবেক সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে আর বিভাগীয় প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ৮০ শতাংশ পদের জন্য কেবলমাত্র প্রধান শিক্ষকদের সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে। অথচ আগের নিয়োগবিধিতে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকরা সবাই বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পেতেন। উপরন্তু পদোন্নতি, বিভাগীয় প্রার্থিতার সঙ্গে প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেডের চরম বৈষম্য, টাইম স্কেল জটিলতা, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা প্রাপ্তির বিড়ম্বনাসহ আরও অনেক বঞ্চনা তাদের দীর্ঘদিনের সাথি। তাই যোগ্যতাসম্পন্ন হয়েও নানা বঞ্চনার শিকার সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানো কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা আশা করাটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে অনেকটাই বেমানান।

খোলা চোখে শিক্ষকতাকে যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। আর সেটা যদি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তাহলে প্রশ্নাতীতভাবেই সেটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ। গৎবাঁধা বই পড়িয়ে আর গতানুগতিক পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মেধার যথাযথ বিকাশ ও তার মূল্যায়ন সম্ভব নয়, কারণ একটি শ্রেণিতে থাকা শিক্ষার্থীদের মেধা ও মানসিকতা অভিন্ন নয়। তাছাড়া তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের গতিও এক নয়। ফলে তাদের শেখার ও বোঝার ধরনেও ভিন্নতা রয়েছে। একজন চিকিৎসককে যেমন একই রোগে আক্রান্ত রোগীদের বয়স, শারীরিক শক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় ভেবে ওষুধ নির্বাচন করতে হয়, তেমনি একজন শিক্ষককেও শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা ও বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন ধারা অনুধাবন করে সে অনুযায়ী পাঠদান করতে হয়। সেজন্য তাকে কখনও হতে হয় শিল্পী, কখনও বন্ধু, কখনওবা অন্যকিছু। পাঁচ-দশ বছর বয়সি কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থীদের মনে জায়গা করতে না পারলে শিক্ষার ফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বিবিধ কারণে শ্রেণির পিছিয়ে পড়া বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে শিক্ষককে আলাদা সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে প্রতিকারমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়। এছাড়া দেশের সিংহভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অভিভাবকরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেন। তাদের দৃষ্টিতে শিক্ষকরা জাদুকর, যাদের জাদুবলে নির্দিষ্ট সময়ান্তে সন্তান সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে অর্থ উপার্জনের যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠবে। এককথায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অনেক। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ তারাই জাতির ভিত গড়ার মূল কারিগর। ভিত মজবুতের গুরুত্ব সবাই বোঝে। কিন্তু সেই ভিতকে সুদৃঢ় করতে বিনিয়োগ কেবল কাঁচামালের পেছনে বাড়ালেই হয় না। যারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাঁচামালকে সঠিক নিয়মে ব্যবহার করার কাজ করেন, তাদের প্রতিও নজর দেওয়া আবশ্যক।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হলেই দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার দৃশ্যমান ও ইতিবাচক সুফল পাওয়া সম্ভব। এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা অন্যতম। আর এ সবকিছুর জন্য শিক্ষকদের চেয়ে বড় কুশীলব আর কেউই হতে পারেন না। তৃণমূলের কর্মীদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে ক্রমান্বয়ে বিভাগের সর্বোচ্চ সিঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারলে আধুনিক ও যুগোপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও সফল বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন ও সময়সাধ্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা যথেষ্ট মেধাবী। এছাড়া সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগবিধিতে নারী ও পুরুষের যোগ্যতাও সমান করা হয়েছে। দশকের পর দশক একই পদে আসীন রেখে তাদের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যের বদৌলতে সাময়িক ফায়দা হাসিল করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সার্বিক অবস্থার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন তাদের মানসিক প্রফুল্লতা ও পেশাগত অধিকার পূরণের নিশ্চয়তা।

বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে সময়োপযোগী বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে শিক্ষাবর্ষের শুরুর দিন প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নতুন পাঠ্যবই প্রদান, উপবৃত্তি প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে পাঠদান, ২৬ হাজার বেসরকারি বিদ্যালয় জাতীয়করণ অন্যতম। এছাড়া চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে জামা, জুতা ও ব্যাগ কেনার জন্য এক হাজার টাকা করে প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষকদের মানমর্যাদা উন্নয়নেও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। তিনি রেকর্ডেড অডিও ফোন কলে শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য নিরসনের কথা বলেন। উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে বেতন প্রাপ্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সব সদস্য তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন প্রত্যাশী।

সম্প্রতি শর্তসাপেক্ষে সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৪তম ও ১৫তম থেকে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি। জাতি গঠনের কারিগর শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে তাদের সম্মানজনক বেতন কাঠামোসহ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পদমর্যাদা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এছাড়া গুরুত্ব বাড়িয়ে পেশা হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করে মেধাবীদের আরও বেশি করে আগ্রহী করতে নিয়োগবিধির প্রয়োজনীয় সংশোধনপূর্বক সহকারী শিক্ষক পদ থেকে প্রধান শিক্ষক, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ক্রমান্বয়ে ওপরের নিয়োগযোগ্য পদগুলোয় স্বাভাবিক পদোন্নতির পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রার্থিতার সুযোগ পুনর্নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের উচ্চারিত বেতনবৈষম্য নিরসনসহ শতভাগ পদোন্নতির দাবি পূরণের পথ প্রশস্ত হলে ত্বরান্বিত হবে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের গতি। ফলে দেশ এগিয়ে যাবে কাক্সিক্ষত সমৃদ্ধির দিকে।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best