ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭ আপডেট : ৪৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২০, ১৯:৪৭

প্রিন্ট

সাক্ষাতকারে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী

লঞ্চ দুর্ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা হবে

লঞ্চ দুর্ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা হবে
তৌফিক ওরিন

সম্প্রতি রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে এমএল ‘মর্নিং বার্ড’ নামের একটি লঞ্চ দুর্ঘটনায় পতিত হয়। মর্মান্তিক এই লঞ্চডুবির ঘটনায় ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ দুর্ঘটনায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে নৌ পুলিশ। এছাড়া নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

এই ঘটনায় শোকাহত পুরো দেশ। একে তো মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে অসংখ্য মৃত্যু, তারউপর লঞ্চডুবির ঘটনায় মনে দাগ কেটেছে সকলের। দুর্ঘটনার কারণ সঠিক কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশিত হবে তদন্ত প্রতিবেদন। তারপরও দুর্ঘটনার কারণে সমালোচিত হচ্ছে নৌ ব্যবস্থাপনা।

সাম্প্রতিক লঞ্চ দুর্ঘটনা এবং নৌ খাতের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে ‘বাংলাদেশ জার্নাল’র সাথে সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে কথা বলেছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক তৌফিক ওরিন

বাংলাদেশ জার্নাল: বুড়িগঙ্গার লঞ্চডুবির পর আলোচনায় এসেছে নৌ-খাতের বিশৃঙ্খলার বিষয়টি। নৌ-খাত আসলে কতটুকু সুশৃঙ্খল?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: আমরা একটা সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবেই মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিলাম। এটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল বলেই আমরা একটা হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছিলাম, অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে। সেই রকম একটা জাতিকে ‘৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পরে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, তার মধ্যেই দেশটা বিশৃঙ্খলার মধ্যে চলে গেছে। সেটির রূপকার জিয়াউর রহমান। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কেবল আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন নাই, তাদেরকে পুনর্বাসিত করেছেন। ’ ৭১ এর ঘাতকদেরকে তিনি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছেন। একাত্তরে যেটা যুদ্ধের মাধ্যমে ফয়সালা হয়েছিলো তাদেরকে তিনি বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে দিয়ে দেশ একটা বিশৃঙ্খলার মধ্যে চলে গেছে, সেই বিশৃঙ্খলা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়ার সময়ে দেশের সর্বক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা আরো বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। নৌ-খাত তার বাহিরে ছিলো না। নৌ-খাতের দিকে মনোযোগ দিলে দেখা যাবে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা শুধু নয়, সমগ্র দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রত্যেকটি সেক্টরে সমদৃষ্টি দিয়ে তিনি দেশকে যেভাবে পরিচালনা করছেন, দেশটা এখন একটা সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। প্রতিটি নাগরিক মনে করে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনার দিকে যাচ্ছে, কী পক্ষের বা বিপক্ষের মানুষ। নৌ-খাতও একই অবস্থায় ছিলো। সেই জায়গা থেকে নৌ-খাত আজকে একটি শৃঙ্খলার জায়গায় গেছে।

নৌ খাতের শৃঙ্খলার জন্য আমরা অনেক ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। যেগুলোর সুফল আমরা পাচ্ছি। আমাদের আরো কিছু কার্যক্রম বাকি আছে। সেগুলো আমাদের নৌ সেক্টরে আমরা যদি অন্তর্ভুক্ত করতে পারি তাহলে আমরা এটা আরো সুশৃঙ্খল হবে।

এক সময়ে মানুষ সদরঘাটে যেত না। তাদের একটা নেগেটিভ ধারণা ছিলো। এখন সেটি পরিবর্তন হয়েছে, সদরঘাট সম্পর্কে মানুষের মাঝে ইতিবাচক ধারণা জন্ম লাভ করেছে। গত ১১ বছরে সদরঘাটের শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুধু নয়, ব্যবস্থাপনায়ও অনেক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের নৌ-পথ গুলোর কোন শৃঙ্খলা ছিলো না, আমারা ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা আনছি এবং এই নৌ পথে অনেক বড় ধরণের ব্যবসায়ী এনভাস তৈরি হয়েছে। এখানে সরকারী বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এখানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। অন্যান্য বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করছে।

বাংলাদেশ জার্নাল: লঞ্চডুবিকে আপনি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেছেন। তাহলে এই হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত বা তাদের বিচারের নিশ্চয়তা কতটুকু?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: যখন মর্নিং বার্ড লঞ্চডুবিটা হয়, সেই সময়ে আমি জায়গাটা পরিদর্শনে যাই। তার আগ মুহূর্তে ভিডিও ফুটেজে কীভাবে মর্নিং বার্ড পানিতে ডুবে গেলো সেই দৃশ্যটা আমি দেখেছি। ভিডিও ফুটেজে যেটা দেখেছি সেই আলোকে আমি বলেছিলাম প্রাথমিকভাবে এটা প্রতীয়মান হয় যে এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এখন সেটা হত্যাকাণ্ড নাকি সেটি না বা আমার কথার কী সত্যতা আছে কিনা তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসবে। তদন্তের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টা উঠে আসবে সেই আলোকে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো এবং এটার বিচার নিশ্চিত করবো। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্ধার কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই মামলা রজু করা হয়েছে। সেই মামলায় কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। কাজেই তদন্ত প্রতিবেদনেও আমরা পাবো কারা অপরাধী। এখানে কারো প্রতি কোন অন্যায় করা হবে না। আমরা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

বাংলাদেশ জার্নাল: নৌ-খাতকে সুশৃঙ্খল করতে এ মুহূর্তে কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: আমরা এখন নকশার ব্যাপারে খুব গুরুত্ব দিয়েছি। সঠিক নকশা অনুযায়ী নিরাপদ জাহাজ তৈরি করা হয়। আমরা ফিটনেসের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। সার্বক্ষণিকভাবে নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমরা ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করেছি। আরো কিছু পদক্ষেপ রয়েছে যেমন ভ্যাসেল ট্রাফিক সিস্টেম (ভিডিএস), অটোমেটিক ট্রাফিক সিস্টেম (এটিএস); এগুলো নিয়ে আমাদের কাজ চলছে। কিছু প্রস্তাবনা আছে সেই আলোকে আমরা পদক্ষেপগুলো যদি আমরা নেই তাহলে এই মনিটরিংগুলো যদি আমরা করতে পারি তাহলে আরো বেশি নিরাপদ হবে বলে আমি মনে করি। এর বাইরে আমরা পরামর্শক নিয়োগ করার প্রস্তুতি চলছে, সেই পরামর্শ সংস্থা আমাদের যে পরামর্শ দিবে সেগুলো আমরা গ্রহণ করবো।

বাংলাদেশ জার্নাল: সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রীকে দপ্তরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বিষয়টি প্রশংসিত। হঠাৎ কেন এ উদ্যোগ?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী: আমি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত, একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী। আমি একজনের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল, সেই রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়েই আমি রাজনীতি করি। কাজেই আমার সরকার আমার দল বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছি। সেই জায়গায় পূর্বসূরি যারা ছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করাটা আমার জন্য খুব ফলদায়ক। সেই আলোকেই আমি মাননীয় সাবেক মন্ত্রীকে আমি মন্ত্রণালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম এবং আমরা আলোচনা করেছি। তার দশ বছরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার অভিজ্ঞতা আমার সাথে শেয়ার করেছেন। আমার যে ভবিষ্যত চিন্তাভাবনা তাকে জানিয়েছি। আমরা সৌহাদ্যপূর্ণ পরিবেশে আমার এই বিষয়গুলো আলোচনা করেছি। আমি মনে করি, এটা শুধু দলীয়ভাবে নয়, এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছি, যে উন্নত দেশ হতে যাচ্ছি, সে উন্নত দেশ হতে গেলে উন্নত চিন্তাভাবনা করতে হবে। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, মানুষের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি হতে হবে, সেটা ছোট বড় যেই হোক না কেন। সেই জায়গা যদি আমরা ডেভেলপ না করতে পারি, তাহলে আমরা হয়তো অর্থনৈতিকভাবে ধনী দেশ হবো তবে উন্নত দেশ হওয়া খুব কঠিন হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত