ঢাকা, শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ২৪ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১১ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২১, ১৮:৪৬

প্রিন্ট

বাবর-মুজিব: মুছে যায় হুল্লোড়ের ঘোলাস্রোতে

বাবর-মুজিব: মুছে যায় হুল্লোড়ের ঘোলাস্রোতে

মোস্তফা কামাল পাশা

ক্ষমা চাই, প্রিয় ভাই, দেরি হয়ে গেল অনেক। যদ্দুর পারি, ভয়ঙ্কর দহণকালে তোমাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, সততা, নিবেদন, নতুন করে দেশি সশস্ত্র হানাদার রাক্ষসমুক্ত দেশ গড়ার কঠিন মুক্তির যুদ্ধ আলোয় আনার চেষ্টা করি। না, এটা নিজের দায় নয়, আমার মিশন। যারা তোমাদের রক্তে কেনা মুক্তির সুফল গলা ডুবিয়ে খাচ্ছে, তারাতো কবেই ভুলে গেছেরে ভাই! প্রচচণ্ড হুল্লোড়ের রাজনীতির ঘোলাস্রোতে কবেই মুছে তোমরা! না গবেষক, না ইতিহাসবিদ আমি। স্রেফ বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী প্রিয় আপা শেখ হাসিনাকে ভালবাসি বলে ভুতের বেগার খেটে যাচ্ছি, ভাই। খাটবই, যদ্দিন বেঁচে আছি।

শহীদ ফখরুদ্দিন মোঃ বাবর। দহণকালে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দুর্দান্ত জীবন্ত মিশাইল! বাগ্মীতায়, নম্রতায় বিনয়ে তুলনাহীন। আবার শত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্র চিতার মতো লড়তে ভয়ডর ছিল না একফোটাও। উত্তর জেলা ছাত্রলীগের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক তুমি। সভাপতি মীরসরাইর আরেক লড়াকু ছাত্রনেতা নুরুল হুদা। দু'জনই চৌকস ও মেধাবী নেতা। হুদা অন্তর্মুখী কিন্তু বাগ্মীতা, স্বচ্ছতায় দারুণ স্বচ্ছন্দ ও প্রাণোচ্ছল। আর বাবর স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, সাহসী। দু'জনই নীতি-আদর্শে অবিচল, নিরাপোষ। ও'সময়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দু'জন প্রায় হাজিরা দিত আন্দরকিল্লা অফিসে। সভায় নানা কারণে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলে ছাত্রলীগের পক্ষে বক্তৃতা করতো বাবর। নাহলে আতাই।

বাবরের গুণ, সাহস, তেজ কাছ থেকেই দেখা। আমি তখন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয়। পেশা সাংবাদিকতা। যা বলতাম সোজাসাপ্টা এবং যুক্তিনির্ভর। আপোষকামীতার ধারেকাছেও নেই। দু'জনই পছন্দ করতো, ভালবাসতো। বাবর খুবই আবেগপ্রবণ। কখনো কোনো কারণে মোশাররফ ভাই বকা দিলে অভিমান করতো, মুছে দিতাম অভিমান। বড় ভাইয়ের মতো জানতো, শ্রদ্ধা করতো। সংগঠনের নানা সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতো। যদ্দুর পারি সভায় তুলতাম, সীমাবদ্ধতা দূরের চেষ্টাও হতো। আসলে তখন আমরা সব এক পরিবারের সদস্য হয়ে ছিলাম। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এক অফিসে। একের দুখে সবাই ঝাপাতাম। কে বড় নেতা বা ছোট বাছবিচার ছিল না। বড় ভাই, ছোট ভাই আমরা মিলেমিশে একপাতে!

সেই বাবর, আফ্রিকান চিতার মত দুর্দান্ত সাহসী, ক্ষিপ্র, বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর জন্য সার্বক্ষণিক নিবেদিত সেনাপতিটি চলে গেল কিনা বড় অসময়ে! সাথে রাউজান কলেজ ছাত্রসংসদ ভিপি আরেক প্রিয়মুখ মুজিবকে সাথে নিয়ে। মুজিব চলে গেল ৫ এপ্রিল ১৯৮৯ এ, বাবর মৃত্যুর সাথে টানা যুদ্ধ করে ১১ এপ্রিল। সা কা ও শিবির ক্যডারেরা অনেক আগেই দু'জনকেই হিট লিস্টের শীর্ষে রাখে। ওদের ট্র্যাক করছিল আগে থেকে। ৫ এপ্রিল রাউজানের হলদিয়ায় জরুরি সাংগঠনিক সভায় যায় তারা। সা কা'র ক্যাডারেরা পথে ওঁৎ পেতেই ছিল। মোহাম্মদ আমির হাটে গাড়ি পৌঁছার আগেই অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র মাস্তান বাহিনী। প্রশাসন পুলিশ সা কা'র কেনা। এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার, কিরিচ, চাপাতি সব অস্ত্র ব্যবহার হয় নির্বিচারে। নিরস্ত্র বাবরেরা প্রতিরোধের সামান্য সুযোগও পায়নি। গুলি, কিরিচের আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করে গাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে সরে যায় ঘাতকদল। তাৎক্ষণিক কারো মৃত্যু না হলেও পথে মারা যায় মুজিব। বাবর চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি ওয়ার্ডে টানা সাতদিন অসম যুদ্ধ চালিয়ে ১১ এপ্রিল চলে যায় না ফেরার দেশে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রায় প্রতি বিকালে তাকে দেখতে যেতাম। মাথার আঘাতের যন্ত্রণার ছটফটানি কি মর্মান্তিক হতে পারে, কাছে না থাকলে বুঝতাম না।

হায় আজ সে ভয়ঙ্কর দিন। পরে তার বোনের শুলকবহরের বাসভবনের মুখোমুখি ভবনে থাকতাম নব্বই দশকের মাঝামাঝি। প্রিয় ছোট ভাইয়ের জন্য বোনের কান্নার নোনা কখনো শুকোয়নি, এখনো না! আমি ততদিনে রাজনীতি থেকে ছুটিতে। যদ্দুর জানি, বাবর, মুজিব হত্যার বিচার হয়নি। হয়নি অসংখ্য ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হত্যার বিচার। আর হবেও বা কবে? বাবর, মুজিবের খুনীদের অনেকে এখন বঙ্গবন্ধুর নৌকায়! কে করবে বিচার? তো ভালো থাকো ভাইয়েরা পরপারে। নিশ্চিত দেখা হবে খুব শিগগিরই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত