ঢাকা, রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৪ মিনিট আগে

জুলাই-আগস্টে রাজধানীতে ৩০০ চুরি

দিনে রেকি করে রাতে চুরি করতো চক্রটি

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৫৩

দিনে রেকি করে রাতে চুরি করতো চক্রটি
গ্রেপ্তার-হাসান ওরফে জিসান বয়াতী ওরফে জিসান ও তার সহযোগী রনি। ছবি: নিজস্ব।
নিজস্ব প্রতিবেদক

চামড়া ব্যবসায়ীর ছেলে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চুরি। সারাদিন মোটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে রেকি করে রাতে নামেন অপারেশনে। বিশ মিনিটেই চুরি শেষ করে চক্র। এরপর সহযোগীর মোটর বাইকে মারেন চম্পট। এমন একটি চোর চক্রের মূলহোতাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- হাসান ওরফে জিসান বয়াতী ওরফে জিসান ও তার সহযোগী রনি। তাদের কাছ থেকে চুরি করা ১০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর রাত আড়াইটায় রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাসার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢুকে আলমারি থেকে ১০ লাখ টাকা চুরি করে পালিয়ে যায় একটি চোর চক্র। এই ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় মামলা হয়। মামলার তদন্ত করেতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ চুরিতে জড়িতদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরে গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের লালবাগ জোনাল টিম শরীয়তপুর এবং রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে গ্রীল কেটে চোর চক্রের দুইজন দুর্ধর্ষ চোর জিসান ও রনিকে গ্রেপ্তার করে।

সম্প্রতি রাজধানীতে চুরির ঘটনা বেড়েছে। সীমানা প্রাচীর টপকে বড় বড় বিল্ডিংয়ে উঠে গ্রিল কেটে লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। সাবেক বা বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাদের বাসা-বাড়িতেও চুরির ঘটনা ঘটেছে। জনপ্রতিনিধিদের বাসা-বাড়িতেও ঘটেছে চুরির ঘটনা। সিসি ক্যামেরা লাগিয়েও চোরের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রাজধানীবাসী।

গত ২৩ আগস্ট রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মোজাম্মেল হকের বাসায় দুর্ধর্ষ চুরি হয়। গ্রিল কেটে ঘরে ঢুকে লকার ভেঙে ৪৫ ভরি স্বর্ণ ও দেশি-বিদেশি টাকা লুট করে দুর্বৃত্তরা।

১৫ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় হাইওয়ে পুলিশের এসপি মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় চুরি হয়। পরে অবশ্য জানা যায়, বাসার বাবুর্চি সাড়ে ৫ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণ লুট করে। ১৮ আগস্ট প্রগতি স্মরণির কুড়িল মিয়া বাড়ি এলাকায় ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসহাক মিয়ার বাড়িতে দিনে দুপুরে ঘটে চুরির ঘটনা। ভবনের নিচে ভাড়াটিয়ার দুটি মোটর সাইকেল নিয়ে চম্পট দেয় চোর চক্র। রাজধানীতে হরহামেশাই ঘটছে এমন চুরির ঘটনা।

ডিএমপির তথ্য বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে জুন মাসে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২৭টি। জুলাই মাসে চুরির সংখ্যা ৭০টি। এ দুই মাসে বিভিন্ন সড়ক ও দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩০০টি।

গোয়েন্দারা বলছেন, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে চুরির ঘটনার তদন্তকালে সিসি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানতে পেরেছেন, জিসান সহযোগী রনির মোটরসাইকেলে করে কেরাণীগঞ্জের আটিবাজার থেকে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের পিছনে যান। সেখানে ২/৩টি বাসায় চুরির চেষ্টা করেন। কিন্তু বাসা-বাড়ির কোনো দরজা, জানালা, বারান্দা খোলা এবং গ্রিল কাটা, ভাঙা বা বাকা করা সম্ভব না হওয়ায় ওই এলাকায় আর চুরি করতে পারেননি তারা। পরে সেখান থেকে মোটরসাইকেলে করে হাতিরপুল কাঁচা বাজারের সামনে যান। সেখানে মোটরসাইকেল রেখে হেটে এলিফ্যান্ট রোডের ৫২ নম্বর সড়কে ২/৩টি বাসায় গ্রিল বেয়ে উপরে উঠে চুরির চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হন তারা। এরপর একই রাতে এলিফ্যান্ট রোডের নতুন-পুরাতন ৫২ নম্বর সড়কের ২১০/১ বাড়ির সীমানা প্রাচীর টপকে বারান্দার গ্রিল বেয়ে তিন তলার বাসায় চুরি করতে প্রবেশ করেন জিসান। ওই বাসার দরজা খোলা দেখতে পেয়ে সেখানে ঢুকেন তিনি। রনি নীচে থেকে চারপাশে নজর রাখতে থাকেন। বাসায় ঢুকে জিসান একটি কাঠের আলমারি খুলে ১০ লাখ টাকা নিয়ে গ্রিল বেয়ে নীচে নেমে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে কেরাণীগঞ্জে চলে যান।

ওই বাসার বাসিন্দা ভুক্তভোগী নারী জানান, তাদের নামাজের রুমে থাকা আলামরি থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে চলে যায় চোররা। বাসার সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে, এক ঘণ্টার মধ্যে কাজ সেরে সটকে যায় চোর।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার জিসান গ্রামের বাড়ি বরিশালে। তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালোখা করেন। পরে সেখান থেকে পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর হাজারিবাগের বৌবাজারের ট্যানারী মোড়ে চলে আসেন। হাজারীবাগে একটি স্কুলে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি। এরপর আর পড়াশোনা করেননি। পরে মাদ্রাসাতেও পড়াশোনার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। এরপর বৌবাজারে চামড়ার শুকানোর কাজ শুরু করেন।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জিসান জানিয়েছেন, এক সময় ১৪/১৫ বছর বয়সে ভাঙারি টোকানোর কাজ করতেন। তখন তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে লোহার রড চুরি করতেন। পরে ২০০২ সালে চোরাই মোবাইল কেনা-বেচার সঙ্গে জড়ান। এরপর থেকে চুরি পেশাকে বেছে নেন। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়িতে গ্রিল কেটে প্রবেশ করে চুরি করেন। এলিফ্যান্ট রোডের বেশ কয়েকটি বাসা-বাড়িতেও গ্রিল কেটে চুরি করেছেন। লালবাগ এলাকার কয়েকটি বাসা-বাড়িতে চুরির ঘটনায় জড়িত জিসান।

গোয়েন্দারা জানান, জিসানের বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় ২টি, হাজারীবাগ থানায় একটি ও নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা থাকার তথ্য পেয়েছেন তারা।

জিসানের সহযোগী রনির বিষয়ে গোয়েন্দারা বলছেন, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে জিসানের সঙ্গে রনির পরিচয় হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়। জিসান মূলত রনিকে চুরির কাজে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের জন্য নিয়োজিত করেন। রনি রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজার এলাকায় ব্যাচেলর মেসে থেকে পাঠাউ চালান। তার পরিবার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে থাকে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, জিসান পেশাদার চোর। উত্তরাধিকার সূত্রে জিসানের পরিবার চামড়া ব্যবসায়ী। কিন্তু জিসান অনেকগুলো চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে ঢাকা মহানগরী এলাকায়। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে আটটি চুরির প্রমাণ আমরা পেয়েছি। পাইপ বেয়ে চার থেকে দশ তলা পর্যন্ত উঠে যেতে পারে সে। হাসান চোর চক্রের হোতা। কিছুদিন পরপর সহযোগী বদল করে সে।

তিনি আরও বলেন, রনি রাইড শেয়ার করলেও জিসানের সঙ্গে চুরি করতেও বের হয়। ওরা দুইজনে মিলে রাতের অন্ধকারে এবং দিনের বেলায় উবার মোটরসাইকেল করে ওলিগলি ঘুরে বেড়ায়। কোন বাসায় চুরি করবে তার চারপাশ রেকি করে। পরে রাতের বেলা চুরি করতে বের হয়। এরা (চোর চক্রে) ডাউন টু আর্থ। এদের অধিকাংশই ভাসমান। গ্রেপ্তার হয়ে জামিন নেয়ার পর লাপাত্তা হয়ে যায়।

ডিসি মশিউর বলেন, চোরদের গ্রেপ্তার করা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। কারণ তারা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক সচেতন।

এদিকে পুলিশ বলছে, চুরির ঘটনাগুলোর তদন্তে গতি বাড়ানোর পাশাপাশি চোর ধরতে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি। বাহিনীটির আটটি বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এবং ৫০টি থানার ওসিদের চোর ধরতে এবং চুরির ঘটনার মামলার আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চুরির মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে কী অবস্থায় রয়েছে, সেসব বিষয়েও প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে নির্দেশনায়।

বাংলাদেশ জার্নাল/সুজন/এমএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত