ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৮ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৫৭

প্রিন্ট

ইউএনওর ওপর হামলা

পাঁচ দিকের তথ্য-প্রমাণে রবিউলের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত পুলিশ

পাঁচ দিকের তথ্য-প্রমাণে রবিউলের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত পুলিশ
ফাইল ছবি (রবিউল)
সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর প্রতিনিধি

দিনাজপুরে আবারও আলোচনায় ঘোড়াঘাটের সদ্যসাবেক ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার ঘটনা। গত মঙ্গলবার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছে, এই ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানকরা আসামি রবিউল ইসলাম জড়িত নয়। ফলে ঘটনাটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, ৫ দিকের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই ঘটনায় রবিউলের সম্পৃক্ততা শতভাগ বলে নিশ্চিত পুলিশ। এই ৫টি তথ্য-প্রমাণে রয়েছে প্রযুক্তিগত তথ্য-প্রমাণ, শারীরিকভাবে রেখে যাওয়ার তথ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ, কোলাবোরেশন এভিডেন্স (সংশ্লিষ্ট সাক্ষী) তথ্য-প্রমাণ এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন।

ওই কর্মকর্তা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, যে ৫টি তথ্য-প্রমাণ রয়েছে তাতে করে শতভাগ নিশ্চিত যে রবিউল ইসলামই এই ঘটনার সাথে একমাত্র পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারী। সংবাদ সম্মেলনে যেসব দাবি করা হয়েছে তা ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

প্রযুক্তিগত তথ্য-প্রমাণ: ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় মূল তথ্য-প্রমাণেই রয়েছে প্রযুক্তিগত। ওই ঘটনার আগে ও পরের ঘটনা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে ঘটনায় রবিউল জড়িত।

পুলিশ প্রযুক্তির যেসব প্রতিবেদন তৈরি করেছে তা হলো- রবিউল ইসলাম ঘটনার দিন অর্থাৎ ২ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ৯ মিনিটে শহরের ঈদগাহ আবাসিক এলাকায় ছিলো। সকাল ১১টা ১৬ মিনিটে সে জেলা প্রশাসক কার্যালয় (ডিসি অফিস) থেকে বের হয়। সেখান থেকে শহরের ষষ্টিতলা মোড়ে মোহাম্মদ আলীর সেলুনে (নাপিতের দোকান) যায় এবং আড়াইটা পর্যন্ত সেখানে মোবাইলে গেম খেলে।

সেলুনের পাশের আইনুল ইসলামের গ্যারেজে সাইকেল রেখে বিকেল ৩টার দিকে তৃপ্তি পরিবহনের একটি বাসে করে ঘোড়াঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় রবিউল। বিকেল ৫টার দিকে তিনি ঘোড়াঘাটের রানীগঞ্জে পৌঁছে এবং সেখান থেকে সন্ধ্যা ৬টা ২৮ মিনিটে ঘোড়াঘাটের ওসমানপুর বাজারে যায়। সেখানে কবিরাজ মশিউরের দোকানের পাশে একটি মাচায় বসে থাকে রবিউল। সিরাজ নামে এক ব্যক্তির মুদি দোকান থেকে ৫টি মিল্ক ক্যান্ডি কেনেন।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে রবিউল সেখান থেকে পায়ে হেঁটে উপজেলা পরিষদের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি মর্ডাণ মসজিদে যান। সেখানে রাত ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেন। নির্মাণাধীন ওই মসজিদের ভিতর থেকে একটি বাশেঁর লাঠি নিয়ে ইউএনওর বাড়ির দিকে রওনা দেন।

শারীরিকভাবে যাওয়ার তথ্য-প্রমাণ: রবিউল ইসলাম ঘটনার দিন বিকেল থেকে পরের দিন ভোর পর্যন্ত ঘোড়াঘাটেই অবস্থান করছিল। শারীরিকভাবে তথ্য-প্রমাণে এই বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

ওইরাতে রবিউলের পড়নের প্যান্টে ইউএনওর শরীরের রক্ত, ইউএনওর বাবার সাথে রবিউলের ধ্বস্তাধ্বস্তি ফলে তার অজান্তেই কিছু তথ্য-প্রমাণ রেখে গেছে রবিউল। এছাড়াও ধাক্কা দিয়ে বাথরুমের দরজা খোলারও ফলেও শারীরিকভাবে কিছু তথ্য-প্রমাণ রেখেছে রবিউল। এছাড়াও তার চলার ভাব-ভঙ্গি রেকর্ড হয়েছে সিসি ক্যামেরায়। তার ব্যবহৃত উপকরণসহ মামলায় সংশ্লিষ্ট যাবতীয় উপকরণ পাঠানো হয়েছে পুলিশের সিআইডি ডিভিশনে।

ফরেনসিক তথ্য-প্রমাণ: রবিউল ইসলাম ওই রাতে যে ঘোড়াঘাটে গিয়েছিলেন এবং ইউএনওর বাড়িতে ছিলেন ফরেনসিক প্রতিবেদনই তার প্রমাণ দেয়। ওই রাতে তার রেখে যাওয়া হাতের ছাপ বিভিন্ন স্থান ও উপকরণ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। প্যান্টে লেগে থাকা ইউএনওর রক্ত এবং ইউএনওর বাবার শরীরের সংস্পর্শের ডিএনএ প্রতিবেদনে প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। সেসব উপকরণ ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষীর তথ্য-প্রমাণ: দিনাজপুর শহর থেকে রবিউলের ঘোড়াঘাটে যাওয়া, ঘোড়াঘাটে উপস্থিতি এবং সেখান থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া টাকা অন্য একজনকে প্রদান- এমন প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ৫ জন স্বাক্ষী রয়েছে। তারা ৫ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন আদালতে।

সাক্ষীরা হলেন, দিনাজপুর শহরের ষষ্টিতলা এলাকার মোহাম্মদ আলীর সেলুনের কর্মচারী মুরাদ, গ্যারেজের স্বত্বাধিকারী আইনুল ইসলাম, ঘোড়াঘাট উপজেলার ওসমানপুর বাজারের মুদি দোকানি সিরাজ, কবিরাজ মশিউরের ছেলে ওলিউল এবং চুরি করা টাকা গ্রহণকারী খোকন।

সেলুনের কর্মচারী মুরাদ জানিয়েছেন, সকাল থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তার দোকানে বসে রবিউল মোবাইলে গেম খেলেছে। রবিউল প্রায়ই ওই সেলুনে চুল কাটাতো। এমনিভাবেই মুরাদ রবিউল ইসলামকে চেনেন। ওইদিন রবিউল সেলুনের কর্মচারী মুরাদের কাছে একশ’ টাকা ধারও চেয়েছিল। পরে রবিউল সাইকেলটি তার দোকানে রাখতে চাইলে মুরাদ সাইকেলটিকে আইনুলের সাইকেল স্ট্যান্ডে রাখার পরামর্শ দেয়।

সাইকেল স্ট্যান্ডের স্বত্বাধিকারী আইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশেষ কাজে বাইরে যাবে বলে রবিউল তার গ্যারেজে সাইকেলটি রাখেন। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ২৫ টাকা পরিশোধ করে রবিউল সাইকেলটি নিয়ে যায়।

ওইদিন রবিউল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ঘোড়াঘাটের ওসমানপুর বাজারে কবিরাজ ও মুদি দোকানের পাশে একটি মাচায় বসে ছিল।

মুদি দোকানি সিরাজ জানিয়েছেন, সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত রবিউল তার দোকানের পাশে মাচায় বসে ছিল। কিন্তু রবিউলের সাথে তার পরিচয় ছিল না। রবিউলকে তার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে অচেনা এক জায়গার নাম বলে। বসে থাকার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে বিশেষ কাজে ইউএনও অফিসে যাবেন বলে জানায়। তার দোকান থেকে রবিউল ৫টি মিল্ক ক্যান্ডি কেনে। পরে পুলিশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও ছবি দেখালে রবিউলকে চিনতে পারে এবং রবিউল ওই রাতে তার দোকানের পাশে ছিলো বলে পুলিশকে জানায়।

ওই কবিরাজি দোকানের স্বত্বাধিকারী মশিউরের ছেলে ওলিউল জানিয়েছেন, সেদিন তার বাবা (মশিউর) কবিরাজি করতে অন্য স্থানে যায়। এ কারণে বাবার দোকানে বসেছিল সে। ওই সন্ধ্যায় রবিউলকে সে মাচায় বসে থাকতে দেখেছে।

এদিকে রবিউল ইউএনওর বাড়ি থেকে ব্যাগে থাকা ৫০ হাজার টাকার যে বান্ডিল নিয়েছিল, তার মধ্যে ৪৮ হাজার ৫শ’ টাকা মুন্সিপাড়া এলাকার খোকন আলী নামে এক ক্রিকেট জুয়াড়িকে দেন।

সেই খোকন আলী জানিয়েছেন, রবিউল ক্রিকেটে বাজি ধরে ৪৮ হাজার ৫শ’ টাকা হেরে যায়। ৩ সেপ্টেম্বর মোবাইলের মাধ্যমে রবিউল ইসলাম তাকে রেলওয়ে স্টেশনে যেতে বলে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রবিউল রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিম গেটের পাশে তাকে নিজ হাতে ৪৮ হাজার ৫শ’ টাকা বুঝিয়ে দেয়।

এই ৫ জন ব্যক্তিই উপরোক্ত কথাগুলো স্বীকার করে স্বাক্ষী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।

আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি: গত ২০ সেপ্টেম্বর রবিউল ইসলাম দিনাজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৭ এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে রবিউল জানিয়েছে, ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রবিউল জেলা প্রশাসকের ফরাস পদে চাকরিতে যোগ দেন। গত বছরের ১ ডিসেম্বর তাকে ঘোড়াঘাটে বদলি করা হয়। সেখানে চাকরির দেড় মাসের মাথায় ইউএনওর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করে এবং সেই অপরাধে তাকে ৫ ফেব্রুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয় ও বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়।

পরে রবিউল সাংসারিকভাবে আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়ে যায়। বারবার ক্ষমা চেয়েও ক্ষমা না পেয়ে সে পরিকল্পনা করে ইউএনওর ওপর হামলার। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ইউএনওর বাড়িতে গিয়ে হামলা করে। ওইদিন ঘোড়াঘাটে যাওয়া, সেখানে হামলা করা ও বাড়িতে ফিরে আসার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন রবিউল ইসলাম।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, রবিউলই এই ঘটনার সাথে জড়িত। তার কথা বলা, চলার ভাবভঙ্গি, জবানবন্দিতে দেয়া বিবরণ, আলামত জব্দ, ফরেনসিক তথ্য সংগ্রহ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য, ঘটনার স্থানের তথ্য এসবের প্রত্যেকটির সাথে প্রত্যেকটির মিল রয়েছে। তবে একটি গোষ্ঠী এই ঘটনাটিকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সত্য সবসময়ই সত্য এবং এটি যে শতভাগ সত্য তা আদালতের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে। ঘটনার প্রত্যেকটি সংশ্লিষ্টতাই প্রমাণ করবে রবিউলই ঘটনার সাথে জড়িত।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত