‘নাম্বারটি উঠিয়ে নিন, বিপদে কাজে লাগবে’
হৃদয় আলম
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:১০

দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে লেখা, ‘নাম্বারটি উঠিয়ে নিন, বিপদে একদিন কাজে লাগবে’। সঙ্গে রয়েছে টেলিফোন নম্বরও। রাজধানীর গ্রীনরোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি ও শ্যামলীতে একই ধরনের পোস্টার টাঙানো।
নাজমুল হুদা। গত মাছ ছয়েক আগে জাকারিয়া হাবিবকে ধার দিয়েছিলেন ১৫ হাজার টাকা। বার বার চাওয়ার পরেও টাকা ফেরত দিচ্ছিলেন না হাবিব। শেষমেশ দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারের দিকে নজর যায় নাজমুলের। তিনি পোস্টারে উল্লেখিত নম্বরে (01877***2985) ফোন করে জানান সমস্যার কথা। ওপাশ থেকে ‘তান্ত্রিক’ তানিয়া আক্তার জানান, ৫২ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নাজমুলের টাকা ফিরিয়ে এনে দিবেন। এরপর খুশি হয়ে তাকে কিছু দিলেই হবে। না দিলেও সমস্যা নেই। আগে কাজ, পরে টাকা।
টাকা পেতে কী করা লাগবে, নাজমুলের এমন প্রশ্নের জবাবে ‘তান্ত্রিক’ তানিয়া জানান, যে টাকা ধার নিয়েছে তার নাম, বয়স লাগবে আর সঙ্গে সাধনার জন্য কিছু জিনিসপত্র; এরপর যা করার তা তিনিই করবেন।
কী সেই জিনিসপত্র- এমন প্রশ্নে কথিত তান্ত্রিক তানিয়া জানালেন, তিন প্যাকেট আগরবাতি, তিন প্যাকেট মোমবাতি, তিনটা ফুল (যেকোনো ফুল), ২১টি মাটির কলস। এসব পেলেই গভীর রাতে শুরু করবেন তন্ত্র-মন্ত্র।
কথিত তান্ত্রিক তানিয়া আরো জানান, এসব জিনিসপত্র দিতে চাইলে তার আস্তায় গিয়ে সরাসরি দেয়া যাবে অথবা না যেতে চাইলে বিকাশের মাধ্যমে ২২শ’ টাকা পাঠিয়ে দিলেই হবে।
তানিয়ার ভাষ্য, ‘কোনো কাজই সহজ না। আপনার বন্ধুর মন আর আগের মতো নাই। তার জন্য সাধন করা লাগবে। মনটাকে বাধ্য করানো সহজ বিষয় না। সাধন হলে সে আপনার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইবে আবার টাকাও দিয়ে যাবে। এখন আপনার বন্ধুর আপনার দিকে খেয়াল নাই। তার নজর পড়েছে আপনার ইনকামের দিকে। সে আপনাকে তো মেরেও ফেলতে পারে। সাবধানে থাকবেন। আমার এখানে আসলে ফোন দিয়ে আসবেন।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন রায়হান হোসেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি দেয়ালে সাঁটানো লিফলেট দেখে যোগাযোগ করেছিলেন অরুণ বৈদ্য নামের অপর এক ‘তান্ত্রিকের’ সঙ্গে। মোবাইলে তিনি জানিয়েছিলেন তার সমস্যার কথা। রায়হান বলেছিলেন, তার কানে সমস্যার কথা। এরপর ওপাশ থেকে অরুণ বৈদ্য নামের ওই কথিত তান্ত্রিক বলেন, ‘মাঝরাতে জিনে থাপ্পড় দিলে কানে এমন ব্যথা হয়। আপনাকে থাপ্পড় দিয়েছিল কিনা দেখতে হবে। চিকিৎসা করতে চাইলে একটা রক্তজবা ফুল, ১০১টি মোমবাতি ও তিন কেজি দুধ লাগবে। কুরিয়ারে পাঠাতে পারেন জিনিস। বেশি জরুরি হলে লোক পাঠিয়ে দিতে পারেন। কাজ হলে খুশি হয়ে যা ইচ্ছে আমাকে দিয়েন। এখন বিকাশ নাম্বার দিচ্ছি, বিকাশে জিনিসের দাম ১ হাজার ২৫ টাকা পাঠিয়ে দিলেই হবে। টাকাটা একটু তাড়াতাড়ি দেবেন। সন্ধ্যার পর আর রক্তজবা জোগাড় করা যাবে না। আপনিসহ তিনজন আছে, তাড়াতাড়ি পাঠালে একসঙ্গে করবো।’
বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলি এমন ধরনের তান্ত্রিক ও কবিরাজের লিফলেটে ভরে গেছে। একেক গলি একেক জনের দখলে থাকে। কোনো কোনো লিফলেট রঙিন। কোনটায় কবুতর, সাপ, গাছ, কঙ্কালসহ নানা কিছুর ছবি। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও এই তান্ত্রিকদের ভিডিও দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো পর্যন্ত যেসব রোগের নিরাময়ের শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, সেসব কঠিন ও দুরারোগ্য রোগের বিবরণ থাকে এসব লিফলেট-পোস্টারে এবং আরো থাকে এসব রোগের সফল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের নিশ্চিত গ্যারান্টি।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মূলত হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও মগসহ নানা ধর্মের সাধক, তান্ত্রিক ও কবিরাজদের এমন প্রচারণা দেখে অনেকেই তাদের শরণাপন্ন হয়। এসব লিফলেটে প্রকাশ্যেই লেখা থাকে, জিন বা বিভিন্ন সাধনার মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। কথিত এসব জিন হুজুর, জিন মাতা, কালি সাধকরা নিজেদের কামরূপ-কামাখ্যার প্রশিক্ষণপ্রাপ্তও দাবি করে।
এসব তান্ত্রিক তাদের লিফলেট-পোস্টারে প্রেম-ভালোবাসার ব্যর্থতা, ব্যবসায় লোকসান, ভালো কাজে বাঁধা, জাদু-টোনা থেকে মুক্তি, মামলা-মোকদ্দমায় জয়, স্বামী-স্ত্রীর অমিল, সংসারে অশান্তি, অবাধ্যকে বাধ্য করা, শত্রু দমন করা, মনের মানুষকে কাছে পাওয়া, পাওনা টাকা আদায়, চাকরি-বিয়ে ও সন্তান সংক্রান্ত সমস্যা, বিদেশ যেতে বাঁধা ও পরকীয়া ঠেকানোসহ নানাবিধ চটকদার সমস্যার সমাধানের কথা বলে।
এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য লিফলেটে এমন সব সমস্যার কথা উল্লেখ করে, যা মানুষের কৌতূহলের অংশবিশেষ। অনেক সময় তারা এসব বিষয় অন্যদের সাথে আলোচনা করতেও নিষেধ করেন। যাতে ভুক্তভোগীরা সচেতন না হতে পারেন। এসব প্রতারণার শিকারদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর বা তরুণ। মূলক বয়ঃসন্ধিকালের কৌতূহল প্রবণতাকে কাজে লাগায় প্রতারক চক্র।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, করপোরেশনের অনুমতি ছাড়া এবং নির্ধারিত ফি না দিয়ে লিফলেট, পোস্টার লাগানো অপরাধ। বিষয়টি দেখে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুনের দায়িত্বে থাকা মোয়াজ্জেম হোসেন টুটুল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, অনুমতি ছাড়া কেউ লিফলেট বা পোস্টার লাগালে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার বিধান আছে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন সময় জরিমানা আদায় করে। তান্ত্রিক বা কবিরাজদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে বিভাগের পক্ষ থেকে অবশ্যই মামলা করা হবে।
এই তথাকথিত তান্ত্রিক বা কবিরাজদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এভাবে লিফলেট লাগানোর জন্য পুলিশ কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। তবে এই তান্ত্রিক বা কবিরাজের খপ্পরে পড়ে কেউ প্রতারিত হলে বা নির্যাতনের শিকার হলে তখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব। তিনি বলেন, তান্ত্রিক, কবিরাজ নামধারীরা লিফলেট ছেপে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বা প্রতারণার প্রস্তুতি নিচ্ছে- এভাবেও বিষয়টিকে দেখা যায়। প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষই বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এই মানুষদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ–উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বললেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা গ্রহণ করেনি এবং যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তা অবশ্যই অবৈধ। তান্ত্রিক বা কবিরাজের লিফলেট ছেপে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে










