ঢাকা, রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ৩১ মিনিট আগে
শিরোনাম

রাষ্ট্রপতি থাকতেই সাহাবুদ্দিনের নামে মামলা!

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ২২:২৫  
আপডেট :
 ২৬ জুলাই ২০২৬, ২৩:০৪

রাষ্ট্রপতি থাকতেই সাহাবুদ্দিনের নামে মামলা!
ছবি: সংগৃহীত

মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগে এক মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছিল, যা সামনে এসেছে প্রায় ১০ মাস পর, যখন তিনি পদত্যাগ করেছেন।

ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।

‘দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লুণ্ঠন ও আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে পারস্পরিক যোগসাজশে’ ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণের অভিযোগ আনা হয় মামলার ২০ আসামির বিরুদ্ধে।

বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে মামলাটি আমলে নেন। একই সঙ্গে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

সর্বশেষ গত ২৩ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ছিল। তবে ওইদিন দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি ৷ এ কারণে ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর আগামী ১১ অগাস্ট প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যায় না। তাহলে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হল কী করে? আদালত তদন্তের নির্দেশইবা কী করে দিল?

মামলার এজাহারে দেখা যায়, ১২ নম্বর আসামির নাম দেওয়া হয়েছে মো. শাহাবুদ্দিন। তার পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক। পাশে ব্র্যাকেটের ভেতরে বলা হয়েছে, “জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেড কর্তৃক মনোনীত এবং ১ নম্বর ও ৩ নম্বর আসামির যোগসাজসে নির্বাচিত।”

জে এম সি বিল্ডার্স লিমিটেডের প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও পরে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন দুদকের সাবেক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন। ব্যাংকের অডিট কমিটিরও সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তিনি সেই পদ ছেড়ে দেন।

রোববার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মামলার শাহাবুদ্দিন আর সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন একই ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়।

কেবল সাহাবুদ্দিনের নামের বানান নয়, তার বাবার নামের বানান এবং ঠিকানাতেও গড়মিল রয়েছে। তার বাবার নাম শরফুদ্দিন আনছারী হলেও মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে সারাফ উদ্দিন আনসারি।

সাহাবুদ্দিনের স্থায়ী ঠিকানা পাবনা জেলায়। তবে মামলায় ঠিকানা লেখা হয়েছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, "মামলার এজাহারে ১২ নম্বর আসামি শাহাবুদ্দিন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি কিনা আমার জানা নেই। আমি ব্যাংকের পক্ষে প্যানেল আইনজীবী হিসেবে মামলা ফাইলিং করেছি। এর বাইরে আমার কিছুই জানা নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে লিস্ট দিয়েছে তা ধরে মামলা ফাইলিং করা হয়েছে।"

পরে মামলার বাদী আবদুচ ছামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন তখন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন, তিনিই এ মামলার আসামি।

মামলার অপর আসামিরা হলেন- ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপ ও এস আলম সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন, আরাস্ত খান, অধ্যাপক মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, ডা. কাজী শহীদুল আলম, মেজর জেনারেল (অব.) আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী ও ডা. মো. সিরাজুল করিম।

কী অভিযোগ?

মামলার অভিযোগ বলা হয়, আসামিদের পরিচালিত ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করে, যা কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ। এসব শেয়ারের মোট দাম ২৫১ কোটি টাকা।

ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা হলেও পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৮ লাখ টাকা। মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের একটি কোম্পানির নামে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ কারণে আসামিরা ‘পরিকল্পিতভাবে, পরস্পরের যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে’ এ লেনদেন সম্পন্ন করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলায় বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করেছিল ২৪টি শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি, যার অনেকগুলোই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

আর্জিতে বলা হয়, এই শেয়ার স্থানান্তরের প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের তারিখ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেয়ার বিক্রি ও কেনার তারিখ একই। অর্থাৎ শেয়ার হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি পূর্ব-পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

“এস আলম গ্রুপ, তার মালিক এবং উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ২৪টি কোম্পানি এবং তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে এই ব্যাংকের উপর দখল প্রতিষ্ঠার কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং তার দায়-দায়িত্বও সম্মিলিতভাবেই তাদের উপর বর্তায়। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনদেন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অবৈধভাবে নিজেরা লাভবান হয়ে জনগণের অর্থের তসরূপে একই অভিপ্রায়ে ফৌজদারী বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে।”

কী বলছে দুদক?

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাহার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারী কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাহার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত হইতে পরোয়ানা জারি করা যাইবে না।”

তাহলে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে মামলা কী করে হল জানতে চাইলে দুদকের প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, "রাষ্ট্রপতি থাকাকালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। হয়ত তারা (বাদীপক্ষ) পরিচয় গোপন করে কোর্টকে মিসগাইড করে আদেশ করিয়ে নিয়েছে।"

তিনি বলেন, "আমি মামলাটা সম্পর্কে অবগত না। দুদক তদন্ত করছে। এখন দুদক সিদ্ধান্ত নেবে কী করা যায়।"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড-সংক্রান্ত একটি মামলার নথিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নাম থাকার কথা বলা হলেও এ বিষয়ে তদন্তের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত দলের কাছে পৌঁছায়নি।

“আদালত থেকে কোনো বিষয় তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হলে তা কমিশনের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া ও অনুমোদন শেষে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আসে। বিষয়টি কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে কি না, সে তথ্যও তদন্ত দলের কাছে নেই।”

তিনি বলেন, কমিশনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও দায়িত্ব না পাওয়া পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে এ ধরনের তদন্ত শুরু করতে পারেন না।

সূত্র: বিডি নিউজ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত