ঢাকা, সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৯, ১৮:৫০

প্রিন্ট

গরুর দাম ২ লাখ, চামড়া ৪০০!

গরুর দাম ২ লাখ, চামড়া ৪০০!
নিজস্ব প্রতিবেদক

এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়ার দাম উঠছে ৩০০ টাকা। আর ছাগলের চামড়ার দাম ২০ টাকা! দুই লাখ টাকা দামের একটি বিশাল গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকায়। সোমবার ঈদুল আজহার দিনে রাজধানীর অস্থায়ী চামড়ার হাটগুলোতে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া। এমনকি অনেক জায়গায় চামড়ার ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এবার পাড়া-মহল্লায় মৌসুমী ব্যবসায়ীদেরও দেখা যায়নি। অন্যদিকে ট্যানারিগুলো লবন দেয়া ছাড়া চামড়া কিনবে না জানানোয় ফড়িয়া ব্যবসায়ীরাও চামড়া কিনতে আগ্রহী নয়।

রাজধানীর গ্রিন রোডে ল্যাব এইড হাসপাতাল ও সাইন্স ল্যাবের মাঝামাঝি স্থানে চামড়ার হাটে দেখা যায় বিক্রেতারা হতাশ। সেখানে তিনটি গরুর চামড়া নিয়ে এসেছেন জাহাঙ্গীর আলম। একটি চামড়া তার গরুর। বাকি দুটি দুই ভাইয়ের দুই গরুর। জাহাঙ্গীর বলেন, তিনটি চামড়ার দাম বলছে মোট ৯০০ টাকা। এত কম দামে কীভাবে বিক্রি করি!

নজরুল ইসলাম মানিক এসেছেন রাজধানীর কলাবাগান থেকে। তিনি একটি গরু ও একটি ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বিক্রি করেছি। গরুর চামড়া বিক্রি করেছি ৪০০ টাকায়। অথচ দুই লাখ টাকার গরু আমার। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি করেছি ২০ টাকায়! এটা দাম হলো বলেন? ব্যবসায়ীরা কি মানুষ? সরকারই বা কী?

পাপ্পু নামের একজন চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ট্যানারি মালিকরা আমাদেরকে বেশি দাম দেয় না। আমরা কীভাবে বেশি দামে কিনব? এই যে কয়েকটি গরুর চামড়া ৩০০ টাকা দিয়ে কিনেছি। এই চামড়ার দাম গতবার ছিল কমপক্ষে ৬০০ টাকা। গতবার যে চামড়ার দাম দিয়েছি ১ হাজার ১০০ টাকা, এবার সেই চামড়ার দাম দিচ্ছি ৬০০ টাকা। অন্তত তিন লাখ টাকা দামের গরুর চামড়ার দাম এবার ৬০০ টাকা।

সাইন্স ল্যাবের চামড়ার হাটে এসব নিয়ে কথা হয় ট্যানারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাখায়াত উল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সারা জীবন একই কথা বলবে। ওদের মুখে সব সময় লেগে থাকবে দাম কম আর দাম কম। এবার কিন্তু খুব একটা দাম কম না। আমি এই হাট থেকে ৬০০ চামড়া কিনেছি। যেখানে ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দামের চামড়া আছে।

সাখায়াত উল্লাহ বলেন, তবে এখানে একটি সমস্যা আছে। সেটা হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা একটি চামড়ায় অন্তত ২০০ টাকা লাভ করবে। আর একটি চামড়ায় লবণ খরচ যাবে ৩০০ টাকা। লবণ খচর বাদ দিয়ে ট্যানারির মূল ব্যবসায়ীরা আরো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লাভ করবে। এতে অরজিনাল বিক্রেতার ক্ষতি হয়। লাভ করে সব মধ্যস্বত্বভোগীরা।

গত ৬ আগস্ট কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারা দেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা। আর বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। সেদিন সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি চামড়ার এ দাম ঘোষণা করেন।

সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া দাম অনুযায়ী, ঢাকায় কোরবানির গরুর প্রতিটি ২০ থেকে ৩৫ বর্গফুট চামড়া লবণ দেওয়ার পরে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় কেনার কথা ট্যানারি মালিকদের। কিন্তু, রাজধানী ঘুরে জানা গেছে, এবার ফড়িয়া বা মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দেখা মিলছে না। কোথাও কোথাও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় চামড়া কিনেছেন। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চামড়া বেচা-কেনা হচ্ছে আরও কম দামে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার চামড়ার দামে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে মানিক নগর এলাকায় মাওলানা আবদুর রহিম বলেন, আমরা দানের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করছি। যেহেতু এবার চামড়ার দাম কমে গেছে। এ কারণে মানিক নগর এলাকায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হয়ত চামড়া কিনছে না। ফলে এই এলাকার কোরবানিদাতারা কাঁচা চামড়া দান করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন।

পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়ার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন বলেন, এখানেও সবচেয়ে ভালো মানের কাঁচা চামড়া ৬০০ টাকায় কেনা সম্ভব হয়েছে। ৩১ বছর আগে ১৯৮৯ সালে কোরবানিদাতারা ৭০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেছেন। এবার সেই মানের চামড়া কেনা সম্ভব হয়েছে ৩০০ টাকারও কম দামে।

রাজধানীর রায়ের বাগ এলাকার বাসিন্দা রূপচান্দ বলেন, অন্যান্য বছর সকাল ১০টার মধ্যে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে থাকেন। কিন্তু, এখন সাড়ে ১১টা বাজে। এখন পর্যন্ত চামড়া কেনার জন্য কোনো লোকজন আসেনি।

মানিকনগর এলাকায় গতবছর কাঁচা চামড়া যারা কিনেছিলেন, তাদের একজন জাবেদ (মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী)। তিনি বলেন, এবার আমরা চামড়া নিচ্ছি না। বাজার খুব খারাপ। পোস্তার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এবার আগে থেকে সাবধান করে দিয়েছেন। লবণ লাগিয়ে মাখিয়ে কয়েকদিন রেখে দিতে বলেছেন। সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, পোস্তার ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে চামড়ায় ত্রুটি দেখিয়ে সেই দাম দেয় না। এজন্য এত ঝুঁকি নিয়ে চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এদিকে ঢাকার বাইরেও চামড়া নেয়ার লোকজন না থাকার কারণে অনেকে বাধ্য হয়েই স্থানীয় মাদ্রাসায় দান করে দিচ্ছেন। তবে এরমধ্যেও যেসব মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনছেন, তারা খুবই অল্প দামে চামড়া কিনছেন। তবে সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া দামের চেয়েও অনেক কম।

অবশ্য ২০১৮ সালের কোরবানির মতো এবারও চামড়া কিনে যাতে বিপদে না পড়েন, সেজন্য মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের আগেভাগেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ মৌসুমি বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যেন চিন্তাভাবনা করে এবার চামড়া কেনেন। কারণ, আমরা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি চামড়া সংগ্রহ করছি না। তবে যারা লবণ দেবেন, তাদের কাছ থেকে আমরা চামড়া নেবো।

এ প্রসঙ্গে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের হাতে এই মুহুর্তে সব চামড়া কেনার মতো টাকা নেই। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবার সব চামড়া হয়ত আমরা কিনতেই পারবো না।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত