ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ২০:৫৫

প্রিন্ট

প্রসঙ্গ: জনপ্রিয়তা

প্রসঙ্গ: জনপ্রিয়তা
রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ

জনসাধারণের কাছে প্রিয় মানুষকে বলা হয়ে থাকে জনপ্রিয়। সোজাসাপ্টা কথায়, এটাই জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা। জনপ্রিয়তা মূলত গুণবাচক শব্দ। এটা ঘোড় দৌড়ের মতো। কে কতো আগে জনপ্রিয় হতে পারে তারই প্রতিযোগিতা চলে কতিপয় মানুষের মধ্যে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আজকাল জনপ্রিয়তা পাওয়া মামুলি একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা নেই, কওয়া নেই- হুট হাট করে মানুষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে করে ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দটি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আজকালকার মানুষের জনপ্রিয়তা দেখে জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে বৈকি।

কিছু মানুষ আছেন, যারা জনপ্রিয়তার পিছনে ছোটে না; বরং জনপ্রিয়তা তাদের পেছনে ছোটে। আবার কিছু মানুষ আছে দিন রাত জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেন। যে কোনো মূল্যে জনপ্রিয়তা ছুঁতে হবে। প্রথম শ্রেণির মানুষ কাজের প্রতি দায়িত্বশীল ও সৎ থাকে। আর দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ কাজের থেকে আত্মপ্রচারে মগ্ন থাকেন বেশি। অনেকটা ‘খালি কলসি বাজে বেশি’ প্রবাদের মতো।

বাংলা সিনে ইন্ডাস্ট্রিতে এই প্রবাদটির বেশি উদাহরণ দেখা যায়। এখানে কাজের চেয়ে কাজের খবর প্রকাশে বেশি আগ্রহী অভিনয়শিল্পীরা। কেউ কোনো একটি সিনেমায় কাজের চুক্তিবদ্ধ হলে খবরের জোয়ার বয়ে যায় গণমাধ্যমগুলোর বিনোদন পাতায়। এক্ষেত্রে তারা বিনোদন সাংবাদিকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। সেই সুসম্পর্কের জোরেই খবর প্রকাশের আবদার। তাদের আবদার ফেলে দেওয়ার তো কথাই ওঠে না।

এদিকে যাদের হাতে একেবারে সিনেমা থাকে না। খবর প্রকাশের কোনো কাজ থাকে না, তারা বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ করে নায়িকারা বিভিন্ন সময়ে সুড়সুড়ি মার্কা ছবি আপলোড দিয়ে আলোচনার টেবিলে থাকতে চান। কেননা, আলোচনায় থাকা মানেই নিজের কাটতি বাড়ানো। যেদিন আলোচনা হবে না সেদিন হারিয়ে যাবেন তিনি। এই হারিয়ে যাওয়ার ভয়টা তাদের পেয়ে বসে।

আলোচনার টেবিলে থাকতে চাওয়াদের কাছে, এটাকে জনপ্রিয়তা বলে। কিন্তু তারা অনুধাবন করতে পারেন না, জনপ্রিয়তা মানে সার্বজনীনতা নয়। ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে আলোচনায় থাকতে চাওয়া কেবলই নিজের ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া। এভাবে ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। শত চেষ্টা করেও নিজেকে খুঁজে পান না।

ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অনেক নায়িকা আছেন যাদের ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’। যতটুকু না করে দেখান, তার থেকে বলে বেড়ান। ওইসব নায়িকাদের নাম নেওয়ার আগে ‘জনপ্রিয়’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করে একজন নায়িকার কথা এখানে বলতে হয়, যিনি ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার পর কোনো সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগেই ২৩টি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু আজ অব্দি ওই নায়িকার একটি সিনেমাও ব্যবসা সফল হয়নি। তবুও তিনি রয়েছেন আলোচনায়। নামের আগে বলা হচ্ছে ‘জনপ্রিয়’। জনগণ যাকে প্রিয় নায়িকা মনে করে একটি সিনেমাও ব্যবসা সফল করতে সাহায্য করেনি, তাকে কিভাবে জনপ্রিয় বলা হয় বোধগম্য নয়।

তবে সিনেমা না চলুক। ওই নায়িকা তার ব্যক্তিগত জীবন, খোলামেলা ছবি প্রকাশ করে খবরের উপাদান হচ্ছেন। তিনি ঘোড়ায় চড়লে নিউজ হচ্ছে। বাঁশ বাগানে দাঁড়িয়ে ছবি তুললে নিউজ হচ্ছে। এমনকি ধূমপান করার অর্ধনগ্ন ফটোশুটে নিউজ হচ্ছে দেদারসে। এতে যেমন নায়িকা মৈথুনের মাধ্যম হচ্ছেন, তেমনি গণমাধ্যমগুলোর দৈন্যতার চিত্র ফুটে উঠেছে। দিনকে দিন এই দৈন্যতা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।

শুধু ওই নায়িকা নন। এমন অনেক নায়িকা আছেন। তবে এই নায়িকা একটু বেশি এগিয়ে বলেই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হলো।

হুমায়ূন আজাদ তাই বলে গেছেন, ক্ষুধা ও সৌন্দর্য-বোধের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেসব দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যেসব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে, সেখানে মেদহীন হওয়া রূপসীর লক্ষণ। এজন্যেই হিন্দি আর বাঙলা ফিল্মের নায়িকাদের দেহ থেকে মাংস চর্বি উপচে পড়ে। ক্ষুধার্ত দর্শকেরা সিনেমা দেখে না, মাংস ও চর্বি দেখে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে।

খবরে থাকতে চাওয়া নায়িকারা তাই ওইসব ক্ষুধার্ত দর্শকদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করে থাকেন নিজেদের রগরগে উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে।

সিনেমার নায়করাও এক্ষেত্রে এক কাঠি সরেস। তারা তাদের হানিমুনের খবরসহ নানা ঠুনকো বিষয়ে নিজেদের খবরে রাখতে ভালোবাসেন।

এদিকে সব শিল্পীরা যে খবরে থাকতে চান, তা নয়। কিছু শিল্পী আছেন, নীরবে কাজ করে যান। খবর হোক বা না হোক; তাতে তাদের কিছু এসে যায় না। তারা মনে করেন, নিজের কাজটা ঠিকমতো করলে, এমনিতে খবর খুঁজে নেবে তাকে।

জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রশ্ন বেশ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, জনপ্রিয়তা পরিমাপের মাপকাঠি কি? অতীতে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি যাই থাকুক না কেনো, এখন জনপ্রিয়তা নির্ণয় করা হয় ফেসবুক লাইক, টুইটার কিংবা ইন্সটাগ্রামের ফলোয়ার। আমাদের তারকারা এতে বিশ্বাসী বলেই তারা ওই দিকটায় বেশি মনযোগী। তাদের যত কাজ থাকুক না কেনো কিছুক্ষণ পর পর প্রকাশ করা ছবি, স্ট্যাটাস, ভিডিও কতজন লাইক, শেয়ার দিলো সেটা দেখতে ভুলেন না।

জনপ্রিয়তা এভাবে তালুবন্দী হয়ে যাওয়ার কারণে এই শব্দটার সঠিক প্রয়োগ নিয়ে সত্যিই ভাববার সময় এসেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত