ঢাকা, সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৯, ০০:১৯

প্রিন্ট

নারী দিবসের চোখে বিশ্বকে দেখা

নারী দিবসের চোখে বিশ্বকে দেখা
মনিমুল হক

আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটি কম-বেশি পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নারী সংগঠনের উদ্যোগে বর্নাঢ্য র‌্যালী, সভা-সেমিনার, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হবে। সারা বিশ্বব্যাপী নারীরা প্রতি বছর ৮ মার্চ দিবসটি পালন করে আসছেন পৃথিবীর বুকে তাদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উৎপাদনকে কেন্দ্র করে সমাজ বিবর্তনের পরিক্রমায় আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে শ্রেণি বিভক্ত সমাজের প্রাদুর্ভাবে নারীরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বেঁড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে পিতৃতান্ত্রিক থেকে পুরষতান্ত্রিক সমাজের জগদ্দল পাথরের মতো চাপিয়ে দেয়া মতবাদ ও গ্লানি তাদের অন্দরমহলে বন্দী করে ফেলে। অন্দরমহলের অসূর্যস্পশ্যারা সমাজ অধিপতিদের নিকট সবচেয়ে সতী-সাধ্বী ও গর্বের পাত্রী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। দীর্ঘ যুগের গ্লানিময় স্তূপে নারীরাও এই মানসিকতার শিকার হয়ে পড়েন। ন্যায্য অধিকার ও মর্যদা থেকে বঞ্চিত হয়েও তারা পুরুষের পাশে থেকেই সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়ার নিরলস সংগ্রামটুকু করতে থাকেন। নারীর প্রতি মর্যদা, শ্রদ্ধা ও সম্মানের দৃষ্টি নিয়ে তাদের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে অধিকার সে কথাটি সমাজ সেভাবে কোনো দিন ভেবেও দেখেনি।

পশ্চিমা বিশ্বে শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়ায় নারীরা ঘর থেকে কিছুটা বের হওয়া শুরু করেন। ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে ক’জন অকুতোভয়া শ্রমজীবী নারীর সাহসী প্রতিবাদী জাগরণে বন্দীদশার ঘোর ভেঙ্গে বিশ্বব্যাপী নারীরা তাদের অধিকার বাস্তবায়নে সচেতন হয়ে ওঠেন।

দু’মুঠো রুটি-রুজির সন্ধানে এ শ্রমজীবী নারীরা যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কে এক সুতা কারখানায় কাজ করতেন। দৈনিক ১২ ঘন্টা অমানবিক পরিশ্রম করেও তারা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হতেন। ১৮৫৭ সালের এই দিনে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সুতা কারখানার এ নারীরা মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা নির্ধারণ ও অমানবিক কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নেমে পড়েন এবং নেক্কারজনক পুলিশি বর্বরতার শিকার হন।

১৮৬০ সালে ওই কারখানার নারী শ্রমিকরা ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করে তাদের অধিকার আদায়ের দাবি বাস্তবায়নে সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। সমাজ এগিয়ে যাওয়ার সাথে দিন দিন তাদের এ যৌক্তিক দাবি জোরালো হতে থাকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে তিলে তিলে তা বিশ্বব্যাপী ঝড় তোলে।

১৯০৮ সালে প্রায় ১৫ হাজার নারী তাদের অধিকার আদায়ের জোরালো দাবি নিয়ে নিউইয়র্কের রাজপথে এক বিশাল মিছিলে সমবেত হন। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের উদ্যোগে, জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়।

এরপরের বছর ১৯১০ সালে এ নারী নেত্রীরা ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন করেন। এ সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব রাখেন। প্রস্তাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ সাল থেকে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হবে।

১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। অত:পর ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। নারীদের অধিকার বাস্তবায়নে দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ দিবসটি পালনে বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানান।

এরপর থেকে নারীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রত্যয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে দিনটি। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর দাবি ও আর্থ-সামজিক উন্নয়নের গুরুত্বকে অনুধাবন করে বিগত ১০০ বছরে নারীর অধিকার ও মর্যদাকে অভাবনীয় স্বীকৃতি দিয়েছেন। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, দর্শন, গবেষণা, কূটনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারায় তারা তাদের সমাজ প্রগতির ধারাকে অনেকটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পেরেছেন এবং ধীরে ধীরে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।

আমাদের উপমহাদেশে এ বাংলায় নারীদের ঘর থেকে বের হয়ে আসার সংগ্রামের চিত্রটিও বিশ্ব নারী সংগ্রামের ইতিহাসে নাড়া দিয়েছে। কয়েকজন মহীয়সী নারীর অতুলনীয় অবদানে আমাদের নারী সমাজের অগ্রগতির পথ প্রসস্ত হয়েছে।

প্রাচীনকালের প্রমিলা দেবী স্বামীর রাজ্য রক্ষার্থে তীর ধনুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন; স্পষ্টভাবে তার সখিকে বলেছেন, ‘আমি কি ডরাই সখি ভিক্ষারী রাঘবরে’। খনার বচন খ্যাত খনাকে সমাজের নানান নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। সপ্তম শতকের গণিত শাস্ত্রবিদ লীলাবতী, মধ্যযুগের সুলতানা রাজিয়া, চন্দ্রাবতী এবং আধুনিক যুগের রাণী লক্ষীবাঈ, বেগম রোকেয়া, প্রীতিলতা, নবাব ফয়জুন্নেসা, ইলা মিত্র, শামসুন নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালসহ বহু সাহসী অকুতোভয়া নারী অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। নারীর শিক্ষা, মর্যাদা, সম্মান ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে।

এ মহীয়সী নারীদের সংগ্রামের ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের দেশের নারীরা এগিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকেই আমাদের দেশেও নারীরা তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নারীমুক্তির স্পৃহায় দিবসটি পালন করতে থাকেন। আমাদের এ অগ্রসরমান নারীরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যেমন বীরঙ্গনার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি সমাজ বিকাশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অভাবনীয় অবদান রেখে চলেছেন।

বিদেশের মাটিতেও তারা গবেষণাসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করছেন এমনকি অনেক দেশের রাজনীতিতেও ঈর্ষণীয় অবদান রাখছেন। বিগত এক দশকে আমাদের দেশের নারীরা শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ সমাজবিকাশের অন্যান্য দিকগুলোয় নারী প্রগতির ধারাকে গতিশীল করেছেন। এ ক্ষেত্রে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গুরুত্ব দেওয়া বর্তমান সরকারের অবদান প্রশংসনীয়।

বর্তমান সরকার আমাদের দেশে নারীদের এগিয়ে নিতে এবং নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’ প্রণয়ন করেছেন। যা আমাদের নারীদের অধিকার বাস্তবায়নে বড় ধরনের একটি কার্যকরী পদক্ষেপ।

কিন্তু একটি বিষয় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হয়, যখন একটি স্বাধীন দেশে আমাদের নারীরা ধর্ষণ, নির্যাতন ও নানামুখী নিপীড়নের শিকার হন। যখন রাস্তা ঘাটে চলার পথে নানান ধরনের অপমানজনক মন্তব্য বা ইভটিজংয়ের শিকার হন; তখন মনে হয় আমরা সত্যি কি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি আমরা নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে অনেকটা অগ্রসর হয়েছি; কিন্তু সে তুলনায় আমরা কি একটি নারীবান্ধব সমাজ-ব্যবস্থা গড়ে তোলতে পেরেছি? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে পুরুষতান্ত্রিক কূপমন্ডুক চিন্তা ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, নারীদের অধিকার ও মর্যদাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তবেই আমরা পৃথিবীর বুকে একটি সভ্য-আধুনিক বাঙ্গালী জাতি হিসেব মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো।

উন্নত বিশ্বে নারীরা তাদের অধিকার ও মর্যদা নিয়ে অনেকটা এগিয়ে গেলেও উন্নয়নশীল, অনুন্নত, ধর্মান্ধ দেশগুলোতে নারীদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখনো অনেকটা কল্পনার শামিল। এসব দেশে নানান প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই নারীদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে। আধুনিক যুগে এসেও কি নারীরা সেই প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদ চিন্তা- চেতনার ঘানি টেনেই যাবেন? একটি সভ্য ও আধুনিক আর্থসমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলতে হলে নারীদের যেমন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে তেমনি আমাদের পুরুষদেরও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বেড়াজাল ভেঙ্গে নারীদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে।

আসুন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে বসবাসের উপযোগী একটি নারীবান্ধব, সুস্থ সমাজ ও বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলতে নারী দিবসের চোখে বিশ্বকে দেখি। পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়-মনে সাড়া দিক নারীর ন্যায্য অধিকার ও মর্যদা প্রতিষ্ঠার মর্মবাণী।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close