ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ অাপডেট : ৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৪ মে ২০১৯, ১৮:৪৪

প্রিন্ট

চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও কিছু প্রশ্ন!

চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও কিছু প্রশ্ন!
নাজমুল হোসেন

গণমাধ্যম সূত্রে এতদিন জানা যাচ্ছিলো, ‘বাড়ছে সরকারি চাকরির বয়স’। আশায় বুক বেঁধেছিল লাখো তরুণ। সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জানিয়েছিলেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়ে সরকার ইতিবাচক। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ‘সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’। কিন্তু সম্প্রতি সংসদে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। এ যেন তরুণদের ওপর 'বিনা মেঘে বজ্রপাত'!

এখানে লক্ষণীয় যে, প্রস্তাবটি নাকচ করে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির পরিস্থিতি এখন ভালো। এখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত পড়ালেখা হচ্ছে। সেশন জট হচ্ছে না। একজন ২৩ বছর বয়সেই পড়াশোনা শেষ করে ফেলছে। শিক্ষা জীবন শেষের পর ৬ থেকে ৭ বছর পান। এইসময় তারা বহু চাকরির পরীক্ষার অংশ নিতে পারেন।’

মাননীয় মন্ত্রী, আমার বয়স ছাব্বিশ পেরিয়ে। এখনো স্নাতকের সনদ হাতে পাইনি, স্নাতকোত্তর তো পরের কথা। আমার প্রশ্ন হলো, মন্ত্রী মহোদয় কি জানেন আমার মতো লাখ লাখ পরীক্ষার্থী তাদের স্নাতক জীবন শেষ করতে পারে নাই সেশন জটের জন্য (যা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ বিষয়)? তিনি কিভাবে বলেন যে, একজন শিক্ষার্থী ২৩ বছর বয়সেই স্নাতক সম্পন্ন করে ফেলছে! বিদ্যমান বাস্তবতা সম্পর্কে কি মাননীয় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সত্যিই অবগত?

এবার আসি সাত কলেজের কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর বিড়ম্বনা প্রসঙ্গে। ২০১৩-১৪ সেশনে ভর্তি হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে ক্যারিয়ার গোছাচ্ছেন, সেখানে একই সেশনের সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সম্মান শেষ বর্ষের পরীক্ষাই শেষ করতে পারেননি! তাদের অনেকেরই স্নাতক সনদ পেতে পেতে বয়স ২৭ পেরিয়ে যাওয়ার যোগাড় হবে হয়তো! তার দায় কে নেবে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী?

দুঃখজনক হলেও সত্যি, বহুল প্রত্যাশিত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের ঐতিহাসিক সময়পর্বে কোনো দেশ তার তরুণ প্রজন্মের মেধা-মননকে এভাবে এতটা অবহেলা ও অগ্রাহ্য করে বলে জানা যায় না। যেমন জানা যায় না চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা-সংক্রান্ত এতখানি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অন্য কোনো দেশে অনুসরণ করা হয় কিনা। এ প্রসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা উল্লেখ না করলে হয় না। যেমন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, বিভিন্ন প্রদেশে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০ বছর, শ্রীলঙ্কায় ৪৫, ইতালিতে ৩৫ বছর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৮, ফ্রান্সে ৪০, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ এবং সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। আফ্রিকায় চাকরি প্রার্থীদের বয়স বাংলাদেশের সরকারি চাকরির মতো সীমাবদ্ধ নেই। অর্থাৎ চাকরি প্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করা যায়। রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যে যোগ্যতা থাকলে অবসরের আগের দিনও যে কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৯ বছর করেছে। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। অর্থাৎ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে দেহভিত্তিক কিছু পেশা (পুলিশ, আর্মি ইত্যাদি) বাদে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের এত বাধা-বিপত্তি থাকে না।

কথায় কথায় আমরা উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার অত্যুগ্র ইচ্ছে পোষণ করব, আর এ রকম গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নিয়মের ক্ষেত্রে তাদের বিপরীতধর্মী পথ অনুসরণ করব। এ রকম স্ববিরোধী সত্তাকে আর কতভাবে কত দিন ধরে রেখে সম্ভাবনাময় লাখো কোটি মানুষের কর্মস্পৃহাকে তুচ্ছজ্ঞান করে তাদের বিপদে ও বিপথে যেতে ইন্ধন যোগাবো?

একজন শিক্ষার্থী ১৬ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষা দেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার কথা ১৮ বছর বয়সে। স্নাতক (সম্মান) পাস করার কথা ২২ বছর বয়সে। স্নাতকোত্তর ২৩ বছর বয়সে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর হলে প্রত্যেকে সাত বছর করে সময় পাওয়ার কথা চাকরির জন্য, চেষ্টার জন্য। পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে তাদের যে সময় নষ্ট হয়, সেই সময় কি সরকার তাদের দিচ্ছে? এ রকম তো কোনো পদ্ধতি চালু নেই যে একজন শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর পাসের পরদিন থেকে হিসাব করে সাত বছর সময় পাবেন চাকরির চেষ্টা করার জন্য। এখন স্নাতকোত্তর শেষ করতে কারো কারো আমার মতো ২৬ থেকে ২৮ বছর লাগে। পদ্ধতিগত কিংবা সেশনজটগত কারণে শিক্ষার্থীর কয়েক বছর ক্ষতির দায় কে নেবে?

২০১৭ সালে পরীক্ষার রুটিনের দাবিতে আন্দোলনে যেয়ে দুই চোখ হারায় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান। সেটা কি সেশন জটের জন্য ছিলো না? এটার মূলেও কিন্তু এই বয়স।

এদেশের তরুণরা এদেশের সম্পদ। এদের যথাযথ ব্যবহারে মনোযোগ দেয়া উচিত। তা না করে দিনের পর দিন অবহেলায় এসব ‘সম্পদ’ অকেজো হয়ে যাচ্ছে। কার্যত তাদের কাজে লাগানোর ব্যাপারে সেরকম কোনো আশানীয় ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাওয়া, যুব সমাজের দিকে আপনার কোমলতা প্রকাশ করুন। বয়সের কারণে একটা বিরাট শিক্ষিত যুব সমাজ পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আপনার সুচিন্তা আবারো কামনা করি।

লেখক: নাজমুল হোসেন, ছাত্র, সরকারী বাঙলা কলেজ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএই্চ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close