ঢাকা, শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ আপডেট : ৩ ঘন্টা আগে

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২১, ০০:২৬

প্রিন্ট

‘বিশ টাকাটা আলমারিতে রেখেছি’

‘বিশ টাকাটা আলমারিতে রেখেছি’
সংগৃহীত ছবি।

তৌহিদুর রহমান তৌহিদ

ছবিতে যে মহিলাক দেখা যাচ্ছে,উনি হাতে বিশ টাকার একটা নোট পেঁচিয়ে ধরে মৃদু হাসিতে ফ্রেমবন্ধী হয়েছেন। খেটে খাওয়া মানুষের পেঁচিয়ে ধরা দশ-বিশ টাকা নোটের আলাদা একটা গন্ধ আছে, মায়া আছে। এই বিশ টাকা নোটের গন্ধের চেয়ে মায়াটা আমার কাছে প্রবল..

উনার দশ বছরের এক ছেলে আছে। স্বামী দিনমজুর, ঢাকায় থাকেন। সকাল বেলা আমার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিসে যখন আসলেন তখন মোটামুটি কাটা কবুতরের মত লাফাচ্ছিলেন।

খুব লাজুক মানুষেরা যখন লজ্জা হারিয়ে বাধ্য হয়ে কিছু করেন তখন তাদের খুব অসহায় দেখায়। লজ্জাটা ঢেকে না রাখতে পারার অসহায়ত্ব!

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে আপনার? আপনি শান্ত হয়ে বসুন।

তিনি গালের একপাশে হাত দিয়ে, কাত হয়ে, কাতর কন্ঠে বললেন, দুই রাইত ঘুমাইতে পারিনি, চোখের পাতা এক করা যায়নি, প্রচুর ব্যাথা! ফ্যান টা একটু জোরে ছাড়া যাবে? খুব গরম লাগিছে..

আমি ফ্যান ছেড়ে দিয়ে, তাকে পরিক্ষা করে দেখলাম, তার Acute Closed Pulpitis (ACP)। ডেন্টালের যাবতীয় রোগ-ব্যাধির ভিতরে এইটার ব্যথা সবচেয়ে তীব্র। এমনই তীব্র যে সাধারনত কোন painkiller কাজ করেনা। দু'চারটা ইঞ্জেকশন দিয়েও সামান্য ব্যাথা কমানোর কায়দা নেই।

সরকারী হাসপাতালে এটা ব্যবস্থা করার উপায় উপজেলা পর্যায়ে নাই বললেই চলে। এগুলা ব্যবস্থা করাতে অনেক লোকবল লাগে। নুন আনতে পানতা ফুরানো, অবহেলিত ডেন্টাল বিভাগে এটা স্বপ্ন বৈকি!

আমি মহিলাটিকে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, আমি আপনার ব্যথা ভাল করে দিবো, কথা দিলাম। শুধু কষ্ট করে বিকালে আমার চেম্বারে আসবেন।

বিকেলে উনি যখন আসলেন, মোটামুটি আহত একটা পাখির মতন অবস্থা।

আমাকে বললেন, আপনার ভিজিট কত?

আমি বললাম, ভিজিট যাই হোক, আপনি চেয়ারে শুয়ে পড়েন আপনার সুস্থ হওয়া, সেবা পাওয়াটা ভিজিটের চেয়ে জরুরী।

মিনিট পাঁচেক পর উনি বলনেন, তিন দিন পর মনে হলে যে আমি দুনিয়ায় আছি। এই তিনদিন আমি কিছু খাই নাই, ঘুমাই নাই, ছাওয়ালকে রাইন্ধা কিছু খাওয়াইতে পারিনাই। ছাওয়ালের বাপ ঢাকা আছে। এতো বিপদে আর কোনদিন পড়িনাই। স্যার, আমিতো টাকা বেশী আনিনি, আপনার ভিজিট কত?

বললাম, ৩০০ টাকা। লাজুক একটা হাসি দিয়ে বললেন, আমার কাছে খালি বিশ টাকা আছে!

বললাম, নাহ ভিজিট লাগবেনা, এই যে আপনি তিন দিন পর যে হাসিটা দিলেন এইটাই আমার ভিজিট!

জোর করে বিশ টাকা রাখার আপত্তির মুখে আমি টাকাটা রেখেছি..

আমাকে অনেকেই বলে, ভাই ডেন্টিস্টদের রোগী নিয়ে কোনো আবেগের গল্প নাই। হাঁপানির রোগী, হার্টের রোগী, বয়স্কেদের নিয়ে কতশত মানুষ কত গল্প লেখে কিন্তু আমরা লিখতে পারিনা।

আমি সেদিন বলছিলাম, আমরা হাজার গল্পের রোগী দেখি, শুধু প্ল্যাটফর্মটা আমাদের দিকে ঝুঁকে নেই। এটা ঝুঁকে গেছে ৫০-৫০০ টাকার ভিজিট নির্ভর গল্পের ফাঁদে।

আমরা এক পা দিয়ে ফুটপিস চেপে, এক হাতে হ্যান্ডপিস নিয়ে, আরেক হাতে মিরর নিয়ে, কোমরে দশ পাউন্ডের প্রেশার নিয়ে, বাঁকা হয়ে, দু চোখ অপলক করে ঘন্টার পর ঘন্টা উবু হয়ে যে হাসিটা ফিরিয়ে দেই সেইটা কখনোই কেও দেখবে নাহ..

ছবিতে দেখা যে মহিলার হাসিটা আমি তিনদিন পর ফিরিয়েছি এইগুলা গল্পে আসেনা। উচ্চ মূল্যের কিছু বানিজ্যকে মোড়কে, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের তাচ্ছিল্যে সব ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে যায় দিনের পর দিন।

দাঁতের ডাক্তার হয়ে, ডেন্টু হয়ে সেবা দেয় দিনের পর দিন.. দুই চোয়ালে ৩২ দাঁত নিয়ে পাশ ফিরে অবজ্ঞার যে সুর আসে সেটাকে কান পেতে শুনে স্বপ্ন বুনে যায় প্রতিদিন..

হাসি ফিরুক প্রতি মুখে, অবজ্ঞার যে সুর বাজছে চারপাশে সেটা ভালবাসায় রুপ নিক নিশিদিন।

আমি মানিব্যাগ থেকে বিশ টাকা আলাদা করে আলমারিতে রেখেছি। টাকার গন্ধটা হয়তো অন্যরকম হয়ে যাবে, কিন্তু মায়াটা রয়ে যাবে।

ডেন্টিস্টদের ভিতরের মায়া, এই টাকার মায়ার মতই..

লেখকঃ সহকারী ডেন্টাল সার্জন

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ এন্ড হাসপাতাল (বিসিএস ৩৩)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত