ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৭:৪২

প্রিন্ট

গল্প: ভাষা

গল্প: ভাষা

জাহিদুল কবির রিটন

জুলেখার মনে আনন্দ ও ভয় মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে৷ সে প্রথম মা হচ্ছে৷ এ এক ভিন্ন অনুভূতি৷ যা অনুভব করা যায়, বলে বোঝানো যায় না৷

এতো বড় ঘটনাটি এখনো জানে না নিয়াজ৷ কিভাবে জানবে, জুলেখা তো তাকে বলেনি৷ নিয়াজ যখন জানবে তখন কেমন করবে সে? প্রথম বাবা হবার খুশিতে ডিগবাজি খাবে? নাকি সিনেমার নায়কদের মতো তাকে পাজাকোলে নিয়ে ঘুরানো দেবে? এসব ভেবে নিজে নিজেই লজ্জা পেল জুলেখা৷

অতিবাহিত এই সময়টিকে স্বপ্নের মতো লাগে জুলেখার কাছে৷ সাবলেটের এই রুমটির মধ্যেই ঘুরপাক খায় তার স্বপ্ন৷

এ যে দিবানিশি স্বপ্ন৷ শুধু মাঝে মাঝে স্বপের মধ্যে বোবা ধরার কষ্ট এসে ভর করে তার উপর৷ বোবা ধরার এই কষ্ট সে নীরবে নির্জনে চেপে রাখে৷ আজ সকালেও আচমকা এই কষ্ট এসে ভর করেছিল তার উপর৷

সাবলেটের জীবনে সকাল বেলা বাথরুম ও রান্নাঘর ব্যবহার করতে হয় দ্রুততার সঙ্গে সময়ের হিসাব মেনে৷ জুলেখা অবশ্য এই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে৷ সত্যি বলতে কি, অভ্যস্ত হতে বাধ্য হয়েছে৷

নিয়াজ তখন অফিসে যাবার জন্যে তৈরী হয়ে গেছে৷ তাকে নাস্তা তৈরী করে খেতে দিয়েছে জুলেখা৷ নিয়াজ নাস্তা খাচ্ছে৷ জুলেখা কি মনে করে যেন জিজ্ঞাস করল,আজকেও কি বাসায় ফিরতে তোমার দিরুং হইবো?

এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই অগ্নিমূর্তি হয়ে গিয়েছিল নিয়াজ৷

’ কী বললে তুমি?’

নিয়াজর হঠাৎ করে অগ্নিমূর্তি রূপ দেখে ভয়ে থতমত খেয়ে গিয়েছিল জুলেখা৷ সে বুঝতেই পারছিল না, নিয়াজ কেন এতো রেগে গেল হঠাৎ করে৷ নিয়াজ গতকাল বাসায় ফিরেছে অনেক রাত করে৷ এই জন্যে খুব অস্থিরতার ভেতর দিয়ে তখন সময় কাটিয়েছে জুলেখা৷ আজও তার বাসায় ফিরতে দেরি হবে কিনা এটা জানতে চওয়া তো নিশ্চয়ই অপরাধের মধ্যে পড়ে না জুলেখার৷

জুলেখা চুপ করে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল নিয়াজ৷ সে আগের মতোই রুদ্র কণ্ঠস্বরে বলেছিল,’ কী বললে তুমি? আবার বলো৷’

জুখোর মাথায়ই আসছিল না, এমন করছে কেন নিয়াজ?

নিয়াজ নাস্তার প্লেটটি ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে জুলেখার উপর অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেছিল, দিরুং মানে কি ?

আর সঙ্গে সঙ্গে চট্‌ করে জুলেখা বুঝে ফেলেছিল নিয়াজের রাগের কারণ৷ তার মুখের ভাষার কোন কোন শব্দই তার স্বপ্নের মতো জীবনে বোবা ধরা এক একটা কষ্ট হয়ে দেখা দেয়৷ নিয়াজ নাস্তা শেষ করেনি, রাগে গুম হয়ে হন্‌হন্‌ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে৷ এটা নিয়ে জুলেখাকে বকাঝকা করার মতো সময় তখন ছিল না নিয়াজের হাতে৷

কী করে যে এমন এক একটি শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তা জুলেখা টেরও পায় না৷ সে তার মুখের ভাষার অনেকটা পরিবর্তন করে ফেলেছে ইতোমধ্যে৷ তারপরেও কোথা থেকে যেন এক একটি এমন শব্দ বের হয়ে যায় তীর হয়ে৷ যার পরিণতি হয় তার জীবনে আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে৷

নিয়াজ জুলেখার মুখে আঞ্চলিক ভাষা একদমই শুনতে চায় না৷ জুলেখাও আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিয়াজের মনের এই ইচ্ছা পূরণ করতে৷ নিয়াজের কথা হলো, মানুষ কতো অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, আর তুমি এই সামান্য মুখের ভাষা পরিবর্তন করতে পারবে না৷

নিয়াজের ইচ্ছা পূরণ করতে যেয়ে জুলেখা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মুখের ভাষা সামান্য নয়৷ দীর্ঘ দিনের অভ্যাস এক মুহূর্তে পরিবর্তন করা যায় না৷ বড় মমতা মিশিয়ে বেরিয়ে আসে এক একটি শব্দ মুখ দিয়ে৷ তাকে থামাতে গেলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়৷

তবুও নিয়াজের ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে জুলেখা৷ তার নামটিই কেটে-ছেঁটে ফেলেছে নিয়াজ৷ জুলেখা নামটি বড়ই সেকেলে নিয়াজের কাছে৷ নিয়াজ তাকে ডাকে ’লেখা’ বলে।

গ্রামে জন্ম, বেড়ে উঠা জুলেখার৷ মফস্বলে পড়ালেখা করেছে সে৷ পড়ালেখায় মোটেই মন্দ ছিল না সে৷ তার পড়ালেখার কৃতিত্ত্বের কারণেই নিয়াজের সাথে তার বিয়ে হয়েছে৷ আর এখন তাকে বাধ্য হয়ে নিজেকে নিজের পড়াতে হচ্ছে৷ নতুন করে ভাষা শিক্ষা ! নিয়াজের বক্তব্য - ’ তুমি কি পরীক্ষার খাতায় তোমার গ্রাম্য ভাষায় লিখেছো, নাকি মান ভাষায় লিখেছো ? যদি মান ভাষায় পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারো, তাহলে তোমার মুখের ভাষা কেন সেটা হবে না ?’

নিয়াজের অকাট্য এই যুক্তি খন্ডন করতে পারেনি জুলেখা৷ সব কিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না৷ যুক্তির বাইরেও অনেক কিছু থাকে৷ কিন্তু নিয়াজ তা মানবে না৷ কিংবা জুলেখার মানসিক সীমাবদ্ধতা তা মানাতে পারে না৷

যেহেতু জুলেখার জীবনের স্রোত এসে মিশেছে নিয়াজের সাথে, তাই মিলিত স্রোত অনুকূলেই বৈঠা চালাতে চায় জুলেখা৷ তারপরও মাঝে মাঝে স্রোত নিচে থাকা পাথরের সাথে বৈঠার ঠোক্কর লাগে৷ তখনই বেঠা সহ কেঁপে উঠে সে৷ আজ সকালে বলা দিরুং শব্দটা এমনই কাঁপিয়ে দিয়েছে তাকে৷

তার মা হওয়ার বিষয়টি কয়েকদিন ধরেই আঁচ করতে পারছিল সে নিজেই৷ জীবনে তো অনেককে খুব কাছ থেকে সন্তানের মা হতে দেখেছে সে৷ সেই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে তার নিজের জীবনে৷ আর এই বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণাটি দিয়েছেন লাকি ভাবি৷

লাকি ভাবি হলেন এই বাসার গৃহকর্ত্রী৷ তিনি কয়েকদিন ধরে জুলেখার আচরণ পরখ শেষে গতকাল এই ঘোষণাটি দেন - আলহাম্‌দুল্লিলাহ, লেখা তুমি তো এ বাসায় নতুন বাবু নিয়ে এসেছো !

লাকি ভাবির এই কথা শুনে লজ্জায় চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল জুলেখার৷ লাজে লাল হয়ে গিয়েছিল তার মুখটি তখন৷

লাকি ভাবি বলেছিলেন, লজ্জা পাচ্ছো কেন লেখা , এটি তো খুশির খবর !

লাকি ভাবি এই খুশির খবরটি কাল রাতে নিয়াজকে দিতে পারেনি তার দেরি করে বাসায় ফেরার কারণে৷ আর সকাল বেলা তো কারো সাথে কারোর কথা বলার মতো সময়ই থাকে না৷ ব্যস্ততার হুলস্থুল অবস্থা চলে তখন৷

জুলেখা রাতে নিয়াজকে খুশির সংবাদটি দিতে চেয়েছিল মনে মনে৷ কিন্তু লজ্জার কারণে শেষ পর্যন্ত আর বলতে পারেনি৷ তবে আজ সে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেলবে নিয়াজকে৷

’লেখা কি করো?’

’কিছু করি না ভাবি৷’

’তাহলে বাইরে আসো, কথা বলি৷’

’আইতাছি ভাবি৷’

জুলেখাদের রুমের দরজা ভেজানো অবস্থায় আছে৷ জুলেখা বিছানায় শোয়ে ছিল, এখন সে উঠে বসেছে৷ বাসায় আছে এখন সে আর লাকি ভাবি৷ এই বাসার পুরুষ দু’জন অফিসে চেলে গেছে৷ লাকি ভাবির দুই বাচ্চাই এখন স্কুলে৷ এই সময়টা তাদের দু’জরে কাটে খোশগল্প করে৷ তার পর শুরু হবে রান্নার জন্যে যোগাড়পাতি করা৷ তখনো গল্পগুজব চলে দুজনের মধ্যে৷ তবে সেটা এই সময়টার আড্ডার মতো হয় না৷ তখন চলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথাবার্তা৷ আর এখন হবে ঝাড়া হাত-পায়ে প্রাণখোলা আড্ডা৷

জুলেখাদের রুম সংলগ্ন গ্রিল ঘেরা বারান্দায় পাতা ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে আছে লাকি ভাবি৷ তার পাশের চেয়ারটি টেনে বসলো জুলেখা৷

জুলেখা বসার পর চেয়ারটি সামান্য ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি বসলো লাকি ভাবি৷

’ কী, শরীর দুর্বল লাগে? ’

’ না, এমনেই শুইয়া আছিলাম৷’

’ মনে সাহস রাখবে, ঘাবড়িয়ে যাবা না৷’

জুলেখা লাজুক হাসি হাসলো৷

’ নিয়াজ ভাই বলছো ? মনে তো হয় বলো নাই৷’

লাজুক হাসিটি এখানো ধরে রেখেছে জুলেখা৷

’ শোনো, আমার মুখ থেকে এই খবর প্রথম না শুনে তোমার মুখ থেকে শুনলে বেশি আনন্দ পাবে নিয়াজ ভাই৷ আমার যখন প্রথম বাচ্চাটা পেটে আসলো তখন আমিই বলেছিলাম এই কথা তোমার ভাইকে৷ সে তো এই খবর শুনে খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে দিয়েছে ঘোরানো৷ শরীরের চাপাচাপিতে তখন তার লুঙ্গির গিট গেছে খুলে৷ সে যখন আমাকে ছেড়েছে তখন তার লুঙ্গিও ধপাস্‌ হয়েছে৷ সে তখন দিগম্বর !’

এই কথা শুনে দুহাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে হাসতে লাগলো জুলেখা৷

লাকি বলল, এটিও স্মৃতি, মধুর স্মৃতি ! এরকম মধুর স্মৃতি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করো না৷

রাতের খাবার খাওয়া শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে৷ নিয়াজ বাসায় ফেরার পর থেকেই মনে মনে রিহার্সাল দিচ্ছে জুলেখা৷ এখনো সে খুশির খবরটি বলতে পারেনি তাকে৷ কয়েকবার বলতে যেয়েও আটকে গেছে তার মুখে৷ প্রতিবারই লজ্জা-ঝড় এসে এলোমেলো করে দিয়েছে রিহার্সালের বাক্যটি৷ তবে আজ সে সংকল্প করেছে নিয়াজকে বলবেই একথা৷

নিয়াজ খুব সপ্রতিভ মানুষ৷ কোনো ব্যাপারেই তার কোন দোটানা ভাব নেই৷ জীবনের স্বাদ আর সাধের সন্ধান সে করে এবং তা অর্জণও করে৷ শরীরের ভাঁজে ভাঁজে থাকা লুকোনো রহস্যের ছন্দময় বিন্যাস করতে পারে সে নিপুণ ভাবে৷ জুলেখা ক্লান্ত দেহে দু’চোখ বুজে তা অনুভব করে চিত্তের পুলকতা নিয়ে৷

তবে নিয়াজকে ভয়ও পায় জুলেখা৷ তার অপছন্দের কিছু ঘটলেই সে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে যায়৷ হৈ-চৈ করে না৷ উচ্চস্বরে কথাও বলে না৷ ধীর শান্ত কথার মধ্য দিয়ে আগুনের স্রোত বয়ে যায় তখন৷

স্বল্প দিনের দাম্পত্য জীবনে নিয়াজকে অনেকটা বুঝতে পেরে গেছে সে৷ নিয়াজ যা চায় তা স্পষ্ট করে বলে৷ এই স্বভাবটিই তাকে বুঝতে সহায়তা করেছে জুলেখাকে৷ নিজেকে রহস্যময় করে রাখে না নিয়াজ৷ তাই তার কর্তৃত্বপরায়ণ স্বভাবটা স্পষ্ট হয়ে গেছে জুলেখার কাছে৷ স্পষ্ট হয়ে গেছে তার চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারও৷ শুধু জুলেখাই বলতে পারছে না উথাল-পাথাল করা তার ভেতরের কথাটি৷

’ আজ দুপুরে নাকি কলোনির ভেতর হাইজ্যাকার এসে ঢুকেছিল?’

মেঝেতে থাকা খাবারের বাসনপত্র গোছগাছ করছে জুলেখা৷ কাজ থামিয়ে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে সে বলল, হ্যা, আড়াইটা-তিনটার দিকে৷ ’ গেটের দারোয়ানরা যে কী করে ! এরা নিশ্চয়ই ডিউটি বাদ দিয়ে ঘুমায় !’

’ ওয়াল টপকিয়ে ঢুছে৷’

’ খুব মুশকিল ! কলিং বেল বাজলে ছিদ্র দিয়ে আগে দেখে পরে দরজা খুলবে৷ লাকি ভাবি বাচ্চাদের স্কুল থেকে নিয়ে ফিরেছে ভেবে ধপ্‌ করে দরজা খুলে ফেলো না৷ আগে দেখে নেবে৷ আর লাকি ভাবি বাসায় না থাকলে দরজাই খুলবে না৷ তুমি তো আর তাদের আত্মীয়-স্বজন চিনো না৷ লাকি ভাবি ফিরলে পরে দরজা খুলবে৷ ’ হাইজ্যাকারকে রাস্তা দিয়ে মানুষে দৌড়ানি দিয়েছিল, সে ওয়াল টপকে কলোনির ভিতর ঢুকে পড়েছিল৷’

’ পুলিশ এসে কলোনির ভেতর থেকে ধরে নিয়ে গেছে ?’

’ হ্যা, বারান্দায় দাঁড়িয়েই তো আমরা দ্যাখছিলাম৷’

’ ভয় পাও নাই ?’

’ ভয় পামু কেন !’

’ খুব নাকি মার দিছে পাবলিকে ধরে ৷’

’ মার দিছে মানে, মানুষে ভেদাইয়া নাক-মুখ দিয়া রক্ত বাইর কইরা ফালাইছে৷ পুলিশ তো নিতেই পারে না , টানাটানি করে গাড়িতে তুলছে৷’

হঠাৎ কইে নিয়াজের চেহারার হাসি মাখা স্বাভাবিকতা অদৃশ্য হয়ে গেল৷ সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জুলেখার দিকে৷ নিয়াজের এই হঠাৎ পরিবর্তন জুলেখার নজরে পড়লো, কিন্তু সে দুপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি বলা নিয়ে ব্যস্ত৷

’ মানুষ তো হাইজ্যাকারকে পুলিশের কাছে দেবেই না৷ তাদের কথা, পুলিশের কাছে দিলে পুলিশ টাকা খেয়ে আবার ছেড়ে দেবে৷ পুলিশের পিঠেও কিল-গুতা পড়ছে৷’

কথাগুলো বলার সময় জুলেখার চোখে দুপুরের ঘটনাটি ভাসছে৷ পুলিশ প্রসঙ্গে এসে তার চোখে-মুখে হাসি ফোটে উঠলো৷

কিন্তু নিয়াজের চেহারা গম্ভীর৷ জুলেখার এসব হাসি মাখানো কথা তাকে স্পর্শ করছে না৷ সে ধীর শান্ত কণ্ঠে বলল, ভেদা মানে কি ?

জুলেখা কথা আর হাসার উচ্ছ্বাসের কারনে বুঝতে পারলো না নিয়াজের কথা৷ সে বলল, কি বললা ?

’ বলছি, ভেদা মানে কি ? তুমি তো বললে, মানুষে ভেদাইয়া হাইজ্যাকারের নাক-মুখ দিয়া রক্ত বাহির করছে৷ সেই ভেদা জিনিসটা কি ?’

মুখ দিয়ে যে শব্দ বেরিয়ে গেছে তা আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না সে৷ তার এমনই হয় ! আচমকা কোথা থেকে যেন এরকম একেকটা শব্দ বের হয়ে যায়৷ খুব সতর্কতার পরও এই শব্দগুলি চলে আসে৷ শব্দেরই বা কী দোষ৷ দীর্ঘ দিনের মায়ায় জড়ানো এক একটি শব্দ৷ সে চাইলেই তারা কী তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবে!

তবুও স্বস্তির জন্যে, শান্তির জন্যে এই মায়ায় জড়ানো শব্দগুলি সযত্নে লুকিয়ে রাখতে চায় জুলেখা৷ নিয়াজের পছন্দ মতোই চলতে চায় সে এখন৷

জুলেখা ভীত মনে ব্যাপারটা সহজ করার লক্ষ্যে স্বাভাবিক কণ্ঠে হেসে বলল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে শব্দটা৷ আমি গ্রামের মেয়ে তো !

’ আমি তোমার কাছে ভেদা মানে কি জানতে চেয়েছি ৷’

জুলেখা সকরুণ হাসিটি ধরে রেখেই বলল, ভেদা মানে লাথি৷ এটি আমাদের আঞ্চলিক শব্দ৷

নিয়াজ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জুলেখার দিকে৷ এই চাহনির অর্থ জুলেখা বোঝে৷ আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা নিঃসরণ হচ্ছে; জুলেখা রয়েছে লাভা পরিবেষ্টিত হয়ে৷ লাভায় তলিয়ে যেতে হবে তাকে এখন !

’ আচ্ছা, এগুলো হলো তোমার আঞ্চলিক শব্দ !’

নিয়ারে শীতল দৃষ্টির দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেললো জুলেখা৷

নিয়াজ হিমশীতল কণ্ঠে বলল, আর কি কি আঞ্চলিক শব্দ আছে তোমার ?

এতো ভয়ের মধ্যেও হাসি পেল জুলেখার৷ আঞ্চলিক শব্দ কতো হবে তার, তা তো সে নিজেও জানেনা৷ শত,হাজার,কত?

এই শব্দের মাঝেই তার জন্ম হয়েছে, সে বেড়ে উঠেছে; সেই শব্দগুলিকেই তার এখন লুকাতে হচ্ছে !

করুণ হাসি ফুটে উঠলো জুলেখার মুখে৷ আর সেই হাসি দেখেই নিয়াজের বারুদ-মনে ধপ্‌ করে আগুন জ্বলে উঠলো৷

’কী, তুমি হাসছো ! আমার কথা শুনে তোমার হাসি পাচ্ছে !’

আচমকা জুলেখা বলল, আমি তো ঠারফান না, যে আমার ভেতর হাসি-কান্না থাকবে না৷ ঠারফান মানে কি জানো ? ঠারফান হচ্ছে মূর্তি ৷ এটিও আমাদের একটি আঞ্চলিক শব্দ৷

কথাগুলো বলে নিজে নিজেই বিস্মিত হলো জুলেখা৷ কে তাকে এতো সাহস জোগালো ? কোথা থেকে এলো এই সাহস তার ! সে পরম মমতায় তার পেটের উপর হাত বোলালো৷

নিয়াজ খানিকটা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, তুমি আমার সামনে থেকে চলে যাও৷

এক মুহূর্ত নিয়াজের দিকে তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো জুলেখা৷ গ্রিল ঘেরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে৷ তার গাল বেয়ে অশ্রু নেমে আসছে৷

আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে জুলেখা৷ অগণিত তারা ফোটে রয়েছে সেখানে৷ সে তার ডান হাতটি পেটের উপর ধরে রেখেছে৷ তার কেবলই মনে হচ্ছে, এই সন্তানই তার মায়ের সম্মান ফিরিয়ে আনবে৷ তারা থেকে উজ্জ্বল আলো এসে নামছে তার চোখে৷

বাংলাদেশ জার্নাল/টিআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত