ঢাকা, রোববার, ১৬ মে ২০২১, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ আপডেট : ৫০ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০১ মে ২০২১, ১৬:৪২

প্রিন্ট

দিনমজুর পরিবারের স্বচ্ছল হওয়ার গল্প

দিনমজুর পরিবারের স্বচ্ছল হওয়ার গল্প
মুকুল-চম্পা দম্পতি

আতাউর রহমান ফারুক, মনোহরদী (নরসিংদী) প্রতিনিধি

দিনমজুর স্বামী-স্ত্রীর রক্ত জল করা শ্রমে-ঘামে একটি স্বচ্ছল কৃষক পরিবারে রুপান্তর হওয়ার গল্প। একসময় যাদের না খেয়ে দিন কাটতো, শুধুমাত্র অক্লান্ত পরিশ্রমে কৃষিফসল আবাদ করে অর্ধকোটি টাকার সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তারা। বলছিলাম নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের মুকুল-চম্পা দম্পতির কথা।

একসময় তারা ছিলেন নিতান্ত অভাবী একটি দিনমজুর পরিবার। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো তাদের। পরের জমিতে রোজ কামলা খাটতেন মুকুল। এক টুকরো জমিও ছিলো না তাদের।

ক্রমে ক্রমে পরের জমি বর্গাচাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সচেষ্ট হন তারা। অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিতি আছে স্বামী মুকুল (৪৫) ও স্ত্রী চম্পার (৩৮)। জমিতে খাটা-খাটুনিতেও কেউ কারো চেয়ে কম যান না তারা। সারা বছরই জমিতে মৌসুমি সবজি, বেগুন, ঢেঁড়স, চালকুমড়ো, মিষ্টিকুমড়ো, পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজি ও ফলের আবাদ করতে থাকেন তারা। ধান কেবলই ভাতের জন্য যেটুকু প্রয়োজন হয় সেটুকু আবাদ তাদের।

ধান চাষের চেয়ে এ দম্পতির প্রধান আগ্রহ মৌসুমি শাক-সবজি ও ফলমূলে। এসব করে ধীরে ধীরে তাদের অভাব ঘুচতে থাকে। বাড়িতে ঘর ছিলো না, ঘর করেছেন। মাঠে জমি ছিলো না। প্রথমে ববন্ধকীর মাধ্যমে জমি করেন কিছু। একসময় অভাব তাদের স্বামী-স্ত্রীর হাড়ভাঙ্গা শ্রম-ঘামের কাছে পরাস্ত হয়। একদিন তারা নিজের নামে জমি কেনেন। পরে আরো, এরপর আরো।

এই সেদিনও জমি কিনেছেন তারা। শত শত বিঘে না হলেও চাষযোগ্য জমির হিসেবে এখন তারা পর্যাপ্ত জমির মালিক। তাই বলে পরিশ্রম ছাড়েননি একটুও। বরং জমি বাড়ার পাশাপাশি শ্রমব্যস্ততা সবই বাড়ছে তাদের।

মুকুল দম্পতি বাংলাদেশ জার্নালকে জানান, এই সেদিনও তারা ক্ষেতে উৎপাদিত পেঁপে বিক্রি করেছেন ২ লাখ টাকা। ফলনও ছিলো ভালো। একেকটা পেঁপে ৭/৮ কেজি পর্যন্তও হয়েছে।

শনিবার নয়াপাড়া মাঠে তাদের গোল বেগুন ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিলো মুকুল ও চম্পার সাথে। তারা জানান, এ বছর গোল আলু বিক্রি হয়েছে তাদের ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, লাল শাক, সিম, চাল কুমড়োতে প্রায় ১ লাখ, গোল বেগুন বিক্রি শুরু করেছেন মাত্র। এখনো এর হিসেব শেষ হয়নি। মিষ্টি কুমড়ো বিক্রি করেছেন ২০ হাজার টাকার, ঘরে মজুদ আছে আরো হাজার দশেক টাকার।

আলাপকালে মুকুল জানান, প্রতিদিন ১ হাজার টাকার বিক্রি তার হতেই হবে। বড়ো দাগের আয়গুলোর হিসেব রাখেন তারা। ছোটখাটোগুলোর হিসেব করেন না।

সংসার খরচ কেমন- জানতে চাইলে চম্পা বলেন, তেমন কিছুই না। তেল, লবণ আর মাছ ছাড়া সবই আসে ক্ষেত থেকে। গোয়ালে গরু আছে দুধ দেয়। খোপে কবুতর আছে ৪ জোড়া, মাসে বাচ্চা পান ৪ জোড়া। মুরগি পালেন কয়েকটি। একমাত্র মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষার্থী।

নিষ্ঠাবান কৃষক মুকুল ও তার স্ত্রী চম্পার সাথে আলাপ করে খেয়ে-পড়ে জমি কেনা, বন্ধক, নগদ টাকার মজুদসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকার হিসেব পাওয়া গেছে। এক সময়ের নিঃস্ব এ পরিবারটির শনৈ শনৈ উন্নতি দেখে অনেকেরই এখন চোখ জ্বলছে বলেও জানান মুকুল। অথচ তাদের এ উন্নতি কোনো অসৎ রোজগারে নয়, রীতিমতো রক্ত জল করা শ্রমে-ঘামে।

এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফাতেমা রোজীর কথায়ও তার প্রতিধ্বনি মেলে। তিনি বলেন, পরিবারটির উন্নতির চাবিকাঠি সততা, শ্রম এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চলা।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফারুক হোসেনও বলেন, তারা খুবই পরিশ্রমী ও সৎ একটি কৃষক পরিবার। কৃষি বিভাগের আইপিএম স্কুলের ছাত্র- ছাত্রী হিসেবে পরিবারটির সাথে তার বেশ সখ্যতা রয়েছে। বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে ওই দম্পতি যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবিদার।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত