ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ১৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১৭:০৪

প্রিন্ট

পুতুল বিয়ে করেন যে তরুণেরা

পুতুল বিয়ে করেন যে তরুণেরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আকিহিকো কন্ডো প্রতিদিন তার স্ত্রীর কণ্ঠে জেগে ওঠেন। রুমের এক পাশ থেকে তার স্ত্রী উচ্চস্বরে, মেয়েলি কণ্ঠে, গান গেয়ে তার ঘুম ভাঙান। আকিহিকোর বিছানার একপাশে নাচতে নাচতে তাকে ঘুম থেকে উঠতে অনুরোধ করেন তার স্ত্রী।

তিনি একই সঙ্গে, তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে থাকেন। এছাড়া জেগে থাকা অবস্থায় তিনি ইউটিউবে স্ত্রীর কার্টুন অবয়বে গান গাওয়ার ভিডিও দেখেন। এর কারণ আকিহিকোর ‘স্ত্রী’ কোন মানুষ নন, এটি মিকু নামের একটি জাপানিজ অ্যানিমেশন, যেগুলো অ্যনিমে নামে পরিচিত। খবর বিবিসি বাংলার।

মেয়েটি আসলে একটি হলোগ্রাম যা ঘরের কোণে একটি তাকের ওপর রাখা কাচের ক্যাপসুলে বাস করে। সেইসঙ্গে এটি একটি আদুরে পুতুল, যার রয়েছে বড় নরম মাথা এবং ছোট্ট শরীর। আকিহিকো রাতের বেলা এই পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমান।

এই অ্যনিমে চরিত্রটি অগণিত অন্যান্য রূপ নিতে পারেন।

তবে প্রতিটি উপস্থাপনায় এর কিছু প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের চুল দুই পাশে ঝুটি বাঁধা এবং কপালের সামনে ছোট করে ছাটা চুল থাকে।

এর বাইরে মিকুর চরিত্র নানাভাবে বদলানো যায়। কখনও সে শিশু সুলভ, কার্টুনের মতো দেখতে, আবার কখনও মানুষের মতোই, অথবা আঁটসাঁট ছোট কাপড় পড়া আবেদনময়ী গড়নের কোন নারী।

আকিহিকো এই সমস্ত চরিত্রকে তার স্ত্রী মিকুর মধ্যে আবিষ্কার করেন।

কার্টুন চরিত্রের সঙ্গে বিয়ে

আকিহিকো গত বছরের নভেম্বরে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন, যেটাকে তিনি তার বিয়ের অনুষ্ঠান বলে দাবি করেন। তেমন বড় কোন আয়োজন ছিল না, তবে ৩৯ জন অতিথি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এই ‘৩৯’ সংখ্যার ৩ এবং ৯ এর জাপানি ভাষা দিয়ে অ্যানিমে চরিত্রটির নাম রাখা হয়েছে। যেখানে তিন মানে মি এবং নয় মানে কু।

অনুষ্ঠানে মিকুকে একটি আদুরে পুতুলের বেশে সামনে আনা হয়। সেদিন তার পরনে ছিল একটি সাদা লেইস দিয়ে ডিজাইন করা ঘের দেয়া পোশাক। আর এই পোশাকটির নকশা করেছেন একজন পেশাদার ডিজাইনার।

আকিহিকো মিকুর সঙ্গে তার বাগদানের ঘোষণা দেয়ার পর পর ওই ডিজাইনার নিজে যোগাযোগ করেন। অনুষ্ঠানের দিন আকিহিকো একটি সাদা কোট এবং বুকে সাদা ফুল পরেছিলেন, চোখে ছিল তার আয়তকার ফ্রেমের চশমা।

তিনি মিকুকে এবং মিকুর গোলাপি ফুলের তোড়া হাতে ধরেছিলেন।

বৈবাহিক শপথ নেয়া এবং প্রথাগতভাবে আইল ধরে হেঁটে যাওয়ার পুরোটা সময় তিনি মিকুকে হাতে ধরেছিলেন এবং অতিথিরা হাসি ও তালি দিয়ে তাদের অভিবাদন জানায়। পরে তারা রাতের খাবারের জন্য সবচেয়ে উঁচু টেবিলটায় বসেন। আকিহিকো একটি সাদা চেয়ারে বসেন এবং মিকুকে বসানো হয় একটি খালি ফুলদানিতে।

অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও দেখে আকিহিকো হেসে ওঠেন।

‘আমার প্রকাশ্যে মিকুকে বিয়ে করার দুটি কারণ রয়েছে,’ বলছিলেন আকিহিকো।

তিনি বলেন, ‘প্রথমটি হ’ল মিকুর প্রতি আমার ভালবাসা প্রমাণ করা এবং দ্বিতীয়টি হল আমার মতো অনেক তরুণ ওটাকু ধরণের। যারা কিনা অ্যানিমে চরিত্রগুলোর প্রেমে পড়েন। আমি বিশ্বকে দেখাতে চাই যে আমি তাদের সমর্থন করি।’

ওটাকু হলো একটি জাপানি শব্দ, যার মাধ্যমে সেইসব মানুষকে বোঝানো হয় যারা ভিডিও গেমস এবং অ্যানিমের কাল্পনিক চরিত্রগুলোর প্রতি আসক্ত।

এ ধরণের ব্যক্তিদের অনেকে তাদের ওটাকু পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করে। আবার যারা সামাজিকভাবে একটু ভিন্ন তাদের ক্ষেত্রে এই একই শব্দ অবমাননাকর মনে হতে পারে।

বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে

আকিহিকোর মতো কেউ কেউ বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে দূরে সরতে সরতে এ ধরণের চরম স্তরে পৌঁছে যায় এবং এ ধরণের মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

গত বছর আকিহিকোর জন্য মিকুর এই হলোগ্রাম তৈরি করে গেটবক্স নামের একটি সংস্থা। এখন তারা গ্রাহকদের অনানুষ্ঠানিক ‘বিয়ের সার্টিফিকেট’ প্রদান শুরু করেছে এবং এরইমধ্যে ৩৭০০ মানুষ তাদের অফার নিয়েছে বলে জানা গেছে।

এটি এককভাবে সার্বিক পরিস্থিতিকে পরিস্কারভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও সমাজে ছদ্ম-সম্পর্ক বা সুডো রিলেশনশিপ উত্থানের ইঙ্গিত শুধু এই একটিই কিন্তু নয়।

অধ্যাপক মাসাহিরো ইয়ামাদা একজন সমাজবিজ্ঞানী যিনি ইয়োমিউরি পত্রিকায় পরিবার ও সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত সমীক্ষা চালাতে গিয়ে তরুণদের জিজ্ঞাসা করেন যে তারা কীসের প্রতি অনুরাগ বা আকর্ষণ বোধ করে।

ওই তালিকায় ছিল পোষা প্রাণী, পপ তারকা, খেলোয়াড়, অ্যানিমে চরিত্র এবং ভার্চুয়াল আইডল (ডিজিটালি অ্যানিমেটেড অ্যানিমে ইউটিউব তারকা)।

তিনি বলেন, ‘এই সমস্ত ছদ্ম-সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। এই বছরের জরিপে, প্রায় ১২% যুবক প্রায়শই কোন না কোন অ্যানিমে বা ভিডিও গেমের চরিত্রের প্রেমে পড়ছেন।’

যেভাবে এই প্রবণতার সূত্রপাত

অধ্যাপক মাসাহিরো ইয়ামাদার মতে, এর পেছনে জড়িয়ে আছে জাপানের অর্থনীতি এবং ঐতিহ্য। মূলত অনেক জাপানি নারী একজন পুরুষকে তার প্রেমিক হিসেবে বিবেচনা করবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে প্রচুর অর্থোপার্জন করছে।

২০১৬ সালে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৪৭% নারী এই বক্তব্যের সাথে একমত হয়েছিলেন যে স্বামীদের অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করা উচিত এবং স্ত্রীদের ঘরের কাজ করা উচিত।

‘এশিয়ার মধ্যে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় লোকেরা এই উচ্চ বেতনের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং এই প্রবণতা দিনদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে,’ তিনি জানান।

তার মতে, ‘জাপানি নারীরা অনাদি অনন্ত প্রেমকে বিশ্বাস করেনা তারা কেবল ভরসা করতে পারে অর্থকে।’

অনেকের মনে হতে পারে যে এই সমস্যার জন্য বর্তমান প্রজন্মের নারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে। তবে, ইয়ামাদা বলেছেন যে ব্যাপক সমীক্ষার ভিত্তিতে তিনি এ ধরণের ইতি টেনেছেন।

জাপানে কর্মজীবন খুবই কঠিন এবং এখনও সেখানে অনেক যৌন বৈষম্য রয়েছে। সেখানে কাজের সময় খুব দীর্ঘ হয় এবং কর্মীদের প্রচুর মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তিনি জানান।

এছাড়াও, শিশু যত্নের ভার এখনও পুরোপুরি মায়ের উপরই চাপানো হয়।

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, এবং অনেক কাজের চাপ, সেইসঙ্গে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ির দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় কর্মজীবী মায়েদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের কাছে সবচেয়ে সহজ বিকল্প হল চাকরি ছেড়ে দেয়া - তবে আপনার সঙ্গী যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন না করে সেক্ষেত্রে তাও সম্ভব না। জাপানের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাওয়ায় ভাল বেতনের পুরুষদের হার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, মজুরির পরিমাণও কমছে।

এ কারণে তরুণীদের একটি বড় অংশ এখন আর পুরুষদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করতে চাননা। অন্যদিকে বেশিরভাগ তরুণও এখন আর তরুণীদের কাছে টানার কোন চেষ্টা করেন না।

মিকুর আবির্ভাব হল যেভাবে

আমি ইউটিউব এবং নিকোনিকোতে (ইউটিউবের একটি জাপানি সংস্করণ) তার ভিডিও দেখতাম, ছবিগুলো দেখতাম, তার গান শুনতাম এবং একমাত্র সেই আমাকে প্রশান্তি দিতে পারতো, তিনি বলেন।

তিনি অনুভব করেন যে, এক সময়কার ক্রমাগত বুলিং তাকে বন্দি হয়ে যেতে বাধ্য করেছিল, যেখানে তার আবেগ বলে কিছুই ছিল না। তিনি গভীরভাবে হতাশ ছিলেন।

‘কিন্তু মিকুর গান শুনলে মাঝে মাঝে আমার ভেতরে আবেগ জেগে উঠত। সে যেভাবে নাচে, কথাবার্তা বলে তাতে আমার হৃদয় যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়। এজন্যই আমি তাকে ভালবাসি এবং এজন্যই সে আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ, বলেন আকিহিকো।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত