ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:৩২

প্রিন্ট

চীন ভ্রমণ

চীন ভ্রমণ
মঞ্জুর আহমেদ

নিঃশব্দ-নীরবতা, নত মস্তিষ্কে এক নজর দেখে চলেছেন শত শত মানুষ। কেউ নিজের ক্যাপটি খুলে হাতে ধরা, কারো বা হাতের পুষ্পার্ঘটা যথাস্থানে রেখে হাঁটছেন। পিছে হাজার, লাখো জনতা! মাও সেতুং- চীন বিপ্লবের নেতা, যিনি শুয়ে আছেন-যেন ঘুমিয়েছেন সদ্য! চীনা জাতির মহান এ নেতা সত্তর বছর আগে লং মার্চে নেতৃত্ব করেছেন। বদলে দিয়েছেন চীনকে। এ যে তাঁরই মমি- শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ধীর পায়ে তাইতো হেঁটে চলা লাখো জনতার।

ছোট বেলায় পড়তাম-মাও সেতুং, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে নিজ দেশে কাজে লাগিয়ে আরো কিছুটা পশ্চাৎপদ দেশ চীনকে নেতৃত্ব দেন নয়া বিপ্লবের। সমাজতন্ত্রের কর্মীরা বলতেন, চীন ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদে নিপীড়িত ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক বা নয়া-ঔপনিবেশিক এবং আমলা-মুৎসুদ্দি (বহুজাতিক পুঁজি) পুঁজিবাদীদের দেশ। মাও সেতুং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব দিয়ে নতুন চীন বিনির্মাণ করেন।

চীন আজও তার পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় বা পিছু হঠা, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া ও পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে পুঁজিবাদী ধারা প্রতিষ্ঠার পর সমাজতন্ত্র নিয়ে যত বিতর্ক হোক না কেন, চীন তার ভাষায় ‘বৈশিষ্ট্যময় সমাজতন্ত্র’ নিয়ে এগিয়ে গেছে বহুদূর। সত্তর বছরে বিপুল পরিমাণে দারিদ্র বিমোচন করে, উন্নয়ন দিয়ে গোটা বিশ্বকে নেতৃত্ব করে চলেছে।

চীনের সর্বত্রই উন্নয়ন-উন্নত রাষ্ট্রের চেহারা চোখে পড়বে। এই সত্তর বছরে দারিদ্র কমেছে ৬০ (তথ্যটি যাচাই প্রয়োজন) ভাগের মত। বিশ্বব্যাংকের ২০১১ সালের তথ্য হচ্ছে, গত তিন দশকে (১৯৮১-২০১১) চীন ৭৫ কোটি মানুষকে অতি দারিদ্রসীমা থেকে বের করে এনেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা-চীনকে ‘একঘরে’ করার কোনো চেষ্টায় যে এখন পর্যন্ত কাজে লাগেনি, সেটা স্পষ্ট।

রাজধানী বেইজিংয়ের রাস্তায় চলার পথে আপনাকে মানতেই হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সড়ক, লেন চীনে। সবচেয়ে বেশি সৌন্দর্যমন্ডিত রাজধানী বেইজিং। আর একটি বিষয় না বললেই নয় যে, গোটা চীন নানা ফুলেল সৌন্দর্যে নিজেকে সাজিয়েছে। অন্তত: যে তিনটি প্রভিন্স বা প্রদেশের গোটা দশেক বা তারও বেশি শহরে আমরা ভ্রমণ করেছি, তাতে অন্তত সেটাই মনে হয়।

২২ আগস্ট মধ্যাহ্নে ঢাকায় চীন অ্যাম্বাসির দাওয়াত পেয়ে পরেরদিন পাসপোর্ট জমা, ২৫ আগস্ট ভিসা নিয়ে সে রাতেই ঢাকা ত্যাগ করি আমরা নয় সাংবাদিক। আমাদের দলে ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মিয়া মোহাম্মদ হাসান জাহিদ তুষার, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও সাহিত্যিক, উপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, বাসসের সিনিয়র রিপোর্টার আনিকা রহমান, যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ভাস্কর ভাদুড়ী, রংপুর লাইভ নিউজের ব্যুরো চীপ মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান তালুকদার, রেডিও ঢোলের সজিব বড়ুয়া, আরটিভি’র সিনিয়র রিপোর্টার আবেদা সুলতানা মুক্তা, বাংলাভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার আবু হেনা ইমরুল কায়েস এবং আমি।

ভ্রমণ সূচিতে তিয়েন আনমেন স্কয়ার ও মাও সেতুংয়ের মমি দেখতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে বেইজিং পৌঁছে আমাদের গাইড ও এজেন্সিকে বলতেই তাঁরা সম্মত হন। তবে তাঁরা বলেন, এর জন্য আমাদের ঘণ্টা তিনেক মানুষের ঢলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতে পারে। আমরা তাতেই সম্মত হই। যদিও চীন সরকারের আমন্ত্রণে এই সফর হওয়ায় বিশেষ সুযোগ মেলে, এক ঘণ্টার মধ্যেই মহান নেতার মমি দেখে ফিরতে পারি।

চীনের এ যে উন্নয়ন-অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি, সেটা সম্পর্কে আগ থেকে কিছু ধারণা ছিল। সারা বিশ্বের সচেতন জনগণ মাত্রই জানেন, চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি। লোক সংখ্যার দিক থেকেও বিশ্বে এক নম্বর দেশ। এমন কোনো পণ্য নেই-যা চীন তৈরি করতে না পারে। এই যে ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ও তার উন্নয়ন হয়েছে চীনের ওই বৈশিষ্ট্যময় সমাজতন্ত্র দিয়েই। সাধ্য অনুযায়ী শ্রম, শ্রম অনুযায়ী প্রাপ্তি- এ তত্ত্ব নিয়ে যে সমাজতন্ত্রের যাত্রা চীনে সত্তর বছর আগে শুরু হয়েছিল, শ্রম শোষণ কিম্বা উদ্বৃত্ত বিতরণে কতটা অগ্রগতি হলো সে বিতর্ক করা যায়, তবে তাদের বৈশিষ্ট্যময় অগ্রযাত্রার অগ্রগতি বিশ্ববাসী দেখে চলেছে।

এক তরুণ পার্টি কমরেডকে প্রশ্ন করেছিলাম, এই যে তোমাদের দেশে আলীবাবা বা এমন বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে, তো সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের যে পথ-ধারণা, সত্তর বছরে সেদিকে কতটা আগালে? জবাবটা ছিল এমন- ‘আমার দাদা বলেন, তাঁরা কারোর সঙ্গে দেখা হলে প্রথম জিজ্ঞাসা করতেন তুমি কি আজ কিছু খেয়েছো? এটাই ছিল তাদের প্রথম কুশল বিনিময়। কিন্তু, এখন আমাদের অর্জনটা তো দেখবে।’ এই যে কুশল বিনিময়ের কথা, তা পরে একাধিক প্রবাসী বাঙ্গালীও বললেন।

মাও সেতুংকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আগাতে থাকি ফরবিডেন সিটি বা নিষিদ্ধ শহরের দিকে। ব্রিটেন ও ইতালীর যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট অ্যাম্পেরর’ তে চীনের শেষ সম্রাট পুই-এর জীবনের কিছু অংশবিশেষ দেখানো হয়েছে। চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ এই নিষিদ্ধ শহরে শুটিং করা হয়।......

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএই্চ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত