ঢাকা, রোববার, ১২ জুলাই ২০২০, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ২৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২০, ২০:৫২

প্রিন্ট

আমাদের গৌরবের মুজিব বর্ষ

আমাদের গৌরবের মুজিব বর্ষ
রিয়াজুল হক

যে মানুষটির ইস্পাত কঠিন মনোবলের জন্য অর্জিত হয় স্বাধীনতা, যে মানুষটির জন্ম না হলে সৃষ্টি হতো না বাংলাদেশ, সেই মহানায়কের শততম জন্মদিন। সকলের গৌরবের মুজিব বর্ষের শুরু। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুজিববর্ষ উদযাপিত হবে হবে। সরকারিভাবেও পালিত হবে।

১৭ মার্চ, ১৯২০। বাঙালীদের জন্য আশীর্বাদের দিন। কারণ এই দিনে ইতিহাসের মহান পুরুষ সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয় সন্তান। যার নামের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালীর আত্মপরিচয়। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাঙালী জাতিকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন অসম্ভবের পথ। আমাদের দিয়ে গেছেন দিয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রিয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং দৃঢ়তা সম্পর্কে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত ন্যামের সম্মেলনে বলেছিলেন- I have not seen the Himalayas. But I have seen Sheikh Mujib. In personality and in courage, this man is the Himalayas. I have thus had the experience of witnessing the Himalayas.

একটা গল্প বর্ণনা করা যাক। অনেক অনেক দিন আগের কথা। জনৈক রাজা বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারলেন যে, নতুন একজন রাজা নির্বাচন করার সময় চলে এসেছে। নতুন রাজা নির্বাচন করার জন্য রাজ্যের সকল যুবকদের একসঙ্গে ডেকে পাঠালেন। সবাই একসাথে জড়ো হওয়ার পর রাজা বললেন- আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে এবং অন্য কারো হাতে যাবতীয় দায়িত্ব সমর্পণ করার সময় এসেছে। আমি তোমাদের মধ্যে কেউ একজনের হাতে রাজ্যের সকল দায়িত্ব সমর্পণ করতে চাই। যুবকদের মধ্যে এক ধরনের ভয় এবং উত্তেজনা বিরাজ করতে লাগলো। রাজা বলতে থাকলেন- আমি তোমাদের সবাইকে একটি করে বীজ দেবো, আমি চাই তোমরা তা রোপণ করবে, যত্ন নেবে এবং ঠিক এক বছর পর তোমরা গাছটি নিয়ে ফিরে আসবে।

লিং নামের এক যুবকও ওইদিন উপস্থিত ছিলো এবং যথারীতি সেও একখানা বীজ পেলো। বাসায় ফিরে সে তার মাকে বীজটি দেখালো এবং সব খুলে বললো। সবকিছু শুনে তার মা বীজ রোপণ এবং যত্নে সাহায্য করতে লাগলো। কয়েক সপ্তাহ পরে অন্য সব যুবকেরা বলতে লাগলো যে তাদের বীজ থেকে চারা বের হচ্ছে। কিন্তু লিং তার বীজ থেকে তেমন কিছুই বের হতে দেখলো না। তবুও সে আশা ছাড়লো না এবং নিয়মিত গাছের পরীক্ষা করতে লাগলো যদি কোন চারা বের হওয়ার আভাস দেখা যায়!

ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর সকলে তাদের গাছ নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো কিন্তু লিং এখনও পর্যন্ত কোন আশার আলো দেখতে পেলো না। দেখতে দেখতে এক বছর অতিবাহিত হলো এবং সবাই রাজ দরবারে রাজার সামনে তাদের চারা গাছ নিয়ে হাজির হলো। অনেকেই লিং কে উপহাস করতে লাগলো। হঠাৎ করেই রাজার চোখ পড়ল লিং এর খালি টবের উপর এবং ঘোষণা করলো, তোমাদের পরবর্তী রাজা হচ্ছে লিং।

এই কথা শুনে সবাই অবাক। রাজা বলতে থাকলেন- আমি তোমাদের সবাইকে সিদ্ধ বীজ দিয়েছিলাম যা থেকে চারা বের হওয়া অসম্ভব। আর তোমরা লোভের বশবর্তী হয়ে আমাকে খুশি করার জন্য অন্য বীজ রোপণ করে আজ আমাকে গাছ উপহার দিয়েছো। শুধুমাত্র লিং তার সততা দেখিয়েছে। আর তাই তাকেই পরবর্তী রাজা নির্বাচিত করা হলো।

বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতার কাছ থেকে পাওয়া উপদেশ ‘সিনসিয়ারিটি অব পারপাস এবং অনেস্টি অব পারপাস’ জীবনে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন, তাই কখনো তিনি কোন অবস্থায় পরাজিত হন নাই। বঙ্গবন্ধু সেই ব্যক্তিত্ব যিনি মিথ্যাকে চরমভাবে ঘৃণা করতেন, কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং আমৃত্যু মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেছেন।

অসহায়, নিপীড়িত মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু এক আশীর্বাদ। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইনগুলো যেন শেখ মুজিবেরই কথা বলছে-

ক্ষুদ্র করো না হে প্রভু আমার

হৃদয়ের পরিসর

যেন সম ঠাঁই পায়

শত্রু-মিত্র-পর।

নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো

অন্যের সুখে সুখ পাই আরো,

কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী

ক্ষুদ্র আত্মা যার।

যুক্তরাজ্যের একজন রাজনীতিবিদ টনি বেন লিখেছেন, ‘নেহেরু জিন্না দু’জনেই পশ্চিমা দেশে এসে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, ব্রিটিশ সেকুলার রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে হিন্দু ভারত ও মুসলিম ভারতে ভাগ করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব বিদেশে এসে শিক্ষা লাভ না করেও দেশের মাটিতে বড় হয়ে উপমহাদেশে প্রথম একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তিনি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, সমগ্র ভারতের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো নেতা।’

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর জন্মদিনটি সেদেশে শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আর একটি স্বাধীন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটিও আমাদের দেশে শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। শিশু দিবস উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উদ্দেশ্যে যে চিঠি লিখেছেন, সেটাও এককথায় অসাধারণ।

আজ বঙ্গবন্ধুর কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পাওয়া যায়। বিশ্ব-সভায় বাঙালী জাতির সগর্ব উপস্থিতিই স্মরণ করিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুকে। এ অবিভাজ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি নেই। আর এই দেশের ভূখণ্ড থেকে শুরু করে তাপক্লিষ্ট, কুলি-কামিন, মজুর, কৃষাণ-কৃষাণী, জেলে-বাওয়ালী, বঞ্চিত শ্রেণির মানুষেরা ছিল তাঁর রাজনীতির অবলম্বন। এদের জন্যই তিনি লড়েছেন। শৈশব থেকে আমৃত্যু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করেছেন ।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নো, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, চীনের মাও সেতুংমিশরের নাসের, ভিয়েতনামের হো চো মিন প্রমুখ নেতাদের সাথে বাংলাদেশের শেখ মুজিবের তুলনা করা হয়। কিন্তু কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, শেখ মুজিবের মধ্যে এত বেশি গুণাবলী ছিল, যা এককভাবে আর কোনো নেতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।

বঙ্গবন্ধু এখন শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, তিনি বিশ্বের নেতা, বিশ্ববন্ধু। ২০১৯ সালের ১২-২৭ নভেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ২৫ নভেম্বরে ইউনেস্কোর সকল সদস্যের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে মুজিব বর্ষ পালন করা হবে। মুজিব বর্ষের শুরুর এই দিনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় থাকুক সকল বাঙালীর মনের ভিতর, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best