ঢাকা, সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:২০

প্রিন্ট

অর্থই জীবনের শেষ প্রাপ্তি নয়

অর্থই জীবনের শেষ প্রাপ্তি নয়

জুলফিকার বকুল

মানুষ স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে। স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জীবন সংসারে তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয় অবিরত। এই যুদ্ধটা যদি হয় সুসংগঠিত ও সুনিয়ন্ত্রিত তবে দেরিতে হলেও তাতে বিজয় অর্জন করা সম্ভব। আর যদি যুদ্ধের কৌশলটি চতুরতার সহিত পিছনের দরজা দিয়ে জয়লাভ করার জন্য প্রয়োগ করা হয়, তবে সেই যুদ্ধের জয়লাভের আনন্দ বিজয় অর্জনের মত এতটা মহানন্দ হয় কি না তা একমাত্র উপলব্ধির বিষয়।

মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সত্তায় গড়া। তাই মানুষের পছন্দ, অপছন্দ, চাহিদার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ জীবন যাপন করে আর কেউ জীবন ধারণ করেই জীবনের প্রকৃত স্বাদ নিতে চায়।

এই ভিন্ন মানসিকতার ফলেই স্ব স্ব স্বপ্ন পূরণের নিমিত্তে অবিরাম ছুটে চলেছে মানুষ। আরামপ্রদ জীবন যাপন ও ক্ষমতাধর হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন তাড়না অন্তরালের প্রতিরূপকে ব্যাকুল করে তুলছে প্রতিনিয়ত। কোন সিস্টেম, বিধিমালা অনুসরণের প্রয়োজন নেই। যেকোনো ভাবেই হোক অর্থ উপার্জন করে ক্ষমতাশীল ও প্রভাবশালী হতে হবে।

গ্রামের সাক্ষর জ্ঞানহীন খাজা চাচার মুখে শুনতাম, ‘বল বল নিজের বল, ভাইয়ের বল পাছে, তার চেয়ে অধিক বল টাকা যার আছে।’ জানি না, একজন দিনমজুর অভাবী মানুষ কোন উপলব্ধি থেকে কথাগুলো বলেছিল। তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি চাচার উপলব্ধিটা ঠিক। এমন প্রত্যাশা থেকেই মানুষ দিন দিন নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নানা কৌশল করে হলেও অর্থ উপার্জন করে বিলাসিতায় জীবন যাপন করার চেষ্টা করছে।

আজকাল বিয়ে সাদীর ক্ষেত্রেও দেখা হয় ছেলের অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা কতটুকু। যেখানে ব্যক্তির মূল্যায়ন না করে অর্থকেই বেশি খুতিয়ে দেখা হয়। পরিবারের মধ্যেও এমন চিত্র দেখা যায়। পরিবারের যে সদস্যটি বেশি ইনকাম করে তার মর্যাদা ও প্রাধান্য একটু বেশি থাকে। সমাজে বেশি টাকাওয়ালা ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়া বিচার সালিশ থেকে শুরু করে কোন অনুষ্ঠানই সম্পন্ন হয় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদ পদবীতেও এরাই এগিয়ে।

সর্বোপরি, টাকাই মানুষের মূল চালিকা শক্তি। সত্তারা মরে গেছে। সত্তাবিহীন অবয়বের দৃশ্যমান হওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে সর্বত্র। প্রাকৃতিক শ্রেষ্ঠত্বকে উপেক্ষা করে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়ানোর অপপ্রয়াস চলছে। এ যেন শত নয়, হাজার বছরের পরিকল্পনা। অথচ অল্পও নয়, স্বল্প সময়ের জন্য এ ধরায় আবির্ভাব।

সদ্য পরিশুদ্ধতা অর্জনকারী এক ভদ্র লোক চা স্টলে বসে তার চাকরিজীবী ছেলের প্রশংসা করছিল। তার ছেলে বাড়ি গাড়ি করেছে। মাসে লাখ লাখ টাকা ইনকাম করে। চা স্টলের দরিদ্র মানুষগুলো উৎফুল্ল দৃষ্টি নিয়ে ভদ্র লোকটির কথা হতাশার মধ্য দিয়ে গিলছিল। কারণ, এতো এতো টাকা পয়সার গল্প খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে করলে তাদের মধ্যে লোভ কাজ না করলেও হতাশা কাজ করে। হঠাৎ, মাঝারি বয়সের একটি লোক জিজ্ঞেস করল, ‘শুনেছি আপনার ছেলে একটা অফিসার। কিন্তু বাংলাদেশে অফিসারদের এতো টাকা বেতন দেয় সরকার!’

ভদ্র লোকটি বলল, ‘না, বেতন অতো টাকা না। ঐ.. উপরি ইনকাম আছে।’ এবার দরিদ্র লোকগুলোর হতাশা নিমিষেই দূর হয়ে গেল। কেউ কেউ বলল, ও আচ্ছা। টাকা ওয়ালা ব্যক্তির সামনে অট্টহাসি দিতে না পারলেও সেদিন খেটে খাওয়া মানুষগুলো মৃদু হেসেছিল এই ভেবে যে, তারা দরিদ্র হলেও সৎ উপায়ে রোজগার করে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, সেদিনের সেই পরিশুদ্ধ ভদ্রলোকটি কিন্তু বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করেনি বরং গর্বের সহিত প্রশংসার বুলি আওরাচ্ছিলেন। তার সন্তান উৎকোচের টাকায় বাড়ি গাড়ি করেছে এটা যেন তার অধিকার! তিনি তার সন্তানকে পরিপূর্ণ করে গড়েছেন বলেই তো এতো টাকা ইনকাম করে! ইনকাম এবং উপার্জনের মধ্যে কেমন যেন একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে ‘উপার্জন’ শব্দটি কি কেবল খেটে খাওয়া জীবন ধারণ করা মানুষগুলোর জন্য প্রযোজ্য?

যেমন সুদের পরিবর্তে ইন্টারেস্ট! শিক্ষা গ্রহণ যদি হয় শুধু বেশি ইনকামের আশায়, তাহলে সেই সন্তান কর্ম জীবনে শুধু টাকা ইনকামের নেশায় মত্ত থাকবে। ফলে দুর্নীতির আশ্রয়ে দেশের সম্পদ চুরি থেকে শুরু করে এমন হীন কাজ নেই যা তার কাছে করা অসম্ভব হবে।তাই, জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে একথা ঠিক, তবে সন্তানকে সততা ও নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত না করলে পিতা মাতা হিসাবে দায়বদ্ধতা থেকে যায়। যে দায়বদ্ধতায় আজ হোক বা কাল হোক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

একবার আমার এক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির সাথে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জানতে পারলাম, তিনি তার দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ঐ পদের অতিরিক্ত দায়িত্বের জন্য সম্মানী ভাতা থাকলেও তিনি তা গ্রহণ করেন না। তার কথায়, ‘আমি আমার পদের বিপরীতে যে বেতন ভাতা পাই তা আমার পরিবার পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট।’ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এ যুগেও এমন মানুষ আছে!

আমার পরিচিত সরকারি চাকুরে এক বড়ভাইকে একদিন খুব বিষণ্ণ মনে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই কোন কারণে কি মন খারাপ? উত্তরে বড়ভাই বললেন, ‘না, তেমন না। গতকাল আমার টি টেবিলের কাঁচ ভেঙে গেছে। ভাঙা কাঁচগুলোকে এখনো কোথাও ফেলতে পারিনি। কোথায় ফেলবো সেটাই ভাবছি।’

আমার ভাবনায় ছিল এ আর এমন কী, কিন্তু বড়ভাইয়ের ভাবনায় ছিল হয়তো অন্য কিছু। এমন চেতনার মানুষগুলোও কারো না কারো সন্তান। এসব সন্তানদের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে পিতা মাতার দেয়া মানুষ হওয়ার আদর্শ। যে আদর্শ হয়তো পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চালিত হবে যুগ থেকে যুগান্তরে। হয়তো তার সংখ্যা হবে খুব নগণ্য। কিন্তু এমন এক সময় হয়তো এদেশে আসবে যখন কেবল মানুষ, মানুষকে খুঁজে বেড়াবে অর্থকে নয়। কারণ, অর্থ তখন সব মানুষের কাছেই থাকবে। যখন মানুষ সুদ, ঘুষ, দুর্নীতির অন্ধকারে পড়ে অস্তিত্বের ঠিকানায় পৌঁছানোর জন্য আলো খুঁজবে তখনই কেবল আলোর উৎসের সন্ধান করবে।প্রয়োজনীয়তাই মানুষকে অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত করে। মানুষ বেঁচে থাকতে চায় অনন্তকাল। দেহের পরিসমাপ্তি হলেও আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। তাই বেঁচে থাকতে হলে মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকতে হয়। মানুষই শ্রেষ্ঠ, যদি থাকে মূল্যবোধ।

লেখক: শিক্ষক, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, গাজীপুর।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত