ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২০, ১৩:২৩

প্রিন্ট

এই মহা সংকটে ছাঁটাই করবেন না

এই মহা সংকটে ছাঁটাই করবেন না
জুলফিকার আলি মাণিক

আমরা সবাই বুঝছি, সময়টা বড্ড বেশি বাজে। করোনাকালে সংকটের কল্পনাতীত বহুমুখিতা আমাদের কাকে কোথায় গিয়ে ঠেকাবে তা হয়তো এই মুহূর্তে কেউই জানি না। এখন যারা চাকরি হারাচ্ছে, কাজ হারাচ্ছে, আয় রোজগারের সুযোগ হারাচ্ছে, তাদের মধ্যে লাখো মানুষ ইতোমধ্যেই পরিবার নিয়ে ঢাকা শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ফিরে গেছে গ্রামে।

এই নিম্ন মধ্যবিত্তরা হয়তো কষ্টের জীবনেও আধপেটা খেয়ে, কিংবা কোনো আমিষ না খেয়ে সামান্য টাকা বাঁচিয়ে গ্রামে দরিদ্র মা-বাবা, ভাই-বোনকে পাঠাতো। নিজেদের সন্তানদেরকে রাজধানীর কোনো না কোনো স্কুলে পড়াতো এই স্বপ্ন নিয়ে যে, তারা পড়ালেখা করে একদিন বড় হবে, চাকরি করবে, দুঃখ-কষ্ট ঘুচবে জীবনের; সার্থক হবে এই সংগ্রাম। হয়তো সন্তানেরাও ভাবতো পড়ালেখা করে একিদন আয় রোজগার করবে, মা-বাবাকে সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও মাছ বা মাংস খাওয়াবে। তাদের পূর্ণ না হওয়া সখের কিছু একটা কিনে পুরণ করে দেবে। সেসব স্বপ্নগুচ্ছ কংক্রিটের রাজধানীতে ফেলে রেখে চলে গেছে, যাচ্ছে ও যাবে আরও অসংখ্য পরিবার, লাখ লাখ মানুষ। কারণ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি চাকরি হারাচ্ছে, আয়ের উৎস ও সুযোগটা চলে যাচ্ছে।

এসব বিপন্ন মানুষের জীবনকথা লিখবার, বলবার জন্যই তো আমরা সাংবাদিকতা করি। যেন অসহায়ের পাশে দাঁড়ায় কেউ না কেউ, যেন উদ্ধারের হাতটি বাঁড়িয়ে দেয় কোন মানবিকতার দীক্ষায় আলোকিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। সেইসব সাংবাদিকদের জীবন-জীবিকা যখন বিপন্ন হবার মুখে, তখন তাদের কথা কে বলবে? আমাদের সাংবাদিকদেরই বলতে হবে। আমাদেরকেই পাশে দাঁড়াতে হবে। না, কারও সাথে কোনো যুদ্ধ, লড়াই করবার জন্য নয়, শুধুই আমাদের পেশার বন্ধুদের জীবনটা যেন কেউ বিপন্ন না করে সেইটুকু বুঝিয়ে নিশ্চিত করার জন্য।

পেশাদারিত্ব আজও গড়ে ওঠেনি আমাদের সাংবাদিকতায়, গণমাধ্যমে। তার মধ্যেই আমরা মন্দের ভালো প্রতিষ্ঠান খুঁজে কাজ করার চেষ্টা করি। বেশি অতীতের কথা বলবো না, আমার নিজের দেখা- এক সময় ইত্তেফাক, সংবাদ, বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ অবজারভারে কাজের সুযোগ খুঁজতো সাংবাদিকরা। সেসব পত্রিকার ভাল-মন্দ দেশের গোটা গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করতো। আমার দৃষ্টিতে টেলিভিশনগুলোতে এখনও তেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু সংবাদপত্রে সেই জায়গা স্থান করে নিয়েছে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার।

যত বিতর্কই থাকুক, এটা সত্য, কয়েক দশক ধরে এই পত্রিকা দুটো দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ধারাবাহিকভাবে বেশ ভাল মুনাফা করে আসছে। যার ফলে বিগত দু'দশকে তাদের অনেক সাংবাদিক ও অন্য বিভাগের কর্মীদের মোটরসাইকেল দিয়েছে, অনেক উচ্চপদস্থ সাংবাদিক ও কর্মকর্তা দেড় দশকে দুই-তিনটা গাড়ি পেয়েছেন, আরও বহু সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন উচ্চ পর্যায়ের সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা। যদিও সহকর্মীদের কাছে শুনি, মধ্য ও নিম্নসারির ভাল কাজ করা পরিশ্রমী বহু সাংবাদিককে সামান্য ক'টা টাকার বেতন বাড়ার জন্য তীর্থের কাকের মত অনিশ্চিত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে, গঞ্জনা সইতে হয়েছে, বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর মত শীর্ষ পত্রিকাতেও।

আমাদের চরম বৈষম্যমূলক সমাজে এসব বঞ্চনাকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছি। কিন্তু আজ যখন করোনা ভাইরাসের সংকটের সময় শুনছি প্রথম আলো এক তৃতীয়াংশ সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে, যখন শুনি দ্য ডেইলি স্টারও ছাঁটাই করতে পারে তখন উদ্বেগটা সত্যিই বড় হয়ে ওঠে।

আমি জানি, করোনায় মার্চের শেষে র্সবত্র সাধারণ ছুটি শুরু হবার পর মাত্র একমাস যেতে না যেতেই প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ঘোষণা দেয় তারা কয়েক দশক ধরে ঈদে যে পরিমাণ উৎসব ভাতা বা বোনাস দিয়ে আসছিল, করোনার কারণে আয় বা মুনাফা কমায় সেই বোনাসের চার ভাগের তিন ভাগ কমিয়ে মাত্র একভাগ দেবে। দীর্ঘকাল ধরে বিপুল লাভজনক দুই পত্রিকার সাংবাদিক ও অন্য কর্মীরা সবাই নিশ্চুপ মেনে নিয়ছে বিষয়টি।

তারপর শোনা যাচ্ছিল, পত্রিকা দু'টিতে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন কমানো হবে সবার। সেটা অন্তত জুন মাসে বাস্তবায়ন হয়নি বলে শুনেছি। এখন নতুন খবর হলো, প্রথম আলোতে ছাঁটাই করা হবে এক তৃতীয়াংশ সাংবাদিক ও অন্যান্য বিভাগের কর্মী। আমার একটি পর্যবেক্ষণ, প্রথম আলো তাদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক যে সকল বড় সিদ্ধান্ত নেয় দ্য ডেইলি স্টারও তা অনুসরণ করে বা নিজেরা আলোচনা করে একই ধরনের সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা দুই পত্রিকায় বাস্তবায়ন করে। ফলে এটা স্বাভাবিক আশংকা যে, প্রথম আলো যেহেতু সাংবাদিক ছাটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে, ডেইলি স্টারও সেই পথেই হাটতে পারে। যদিও ভয়ের জায়গাটি আরও বড়।

কভিড-১৯ বা নবীন করোনা ভাইরাস যেমন পেনডেমিক অর্থাৎ অতিমারী বা বিশ্বজুড়ে মহামারীতে রুপ নিয়েছে, তেমনি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মত শীর্ষ দুই লাভজনক পত্রিকা ছাঁটাই শুরু করলে তা আমাদের দেশের গণমাধ্যমে ছাঁটাইয়ের মহামারী তৈরির জন্য অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নিতে পারে গণমাধ্যমের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের দেশে সরকারগুলো যেমন, উন্নত দেশে ভাল কিছু করার দৃষ্টান্ত দিলে বলে ওঠে- কত বড় দেশ! কত কম জনসংখ্যা! কত সম্পদ! আর আমাদের ছোট দেশ, এইটুকু দেশে বিপুল জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ, আমরা কী করে পারবো? আবার কোন উন্নত দেশ যখন কোথাও ব্যর্থ হয়, খারাপ কিছু ঘটে সেখানে, তখন আমাদের সরকারগুলোর যেন মহানন্দ হয়, তখন বড় গলায় বলে- উন্নত দেশগুলোই ব্যর্থ, অত বড় দেশগুলো পারেনি, সেখানে আমরা কী করে পারবো। ভাল কাজ যে করতে চায়না সে কেবলই ভাল কাজ না করার ছুঁতো বা অজুহাত খুঁজে বেড়ায়।

তাই প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের কাছে অনুরোধ, আপনারা এই ভয়াবহ সংকটে গণমাধ্যমে ছাঁটাইয়ের মহামারী তৈরির পথ দেখিয়ে দিয়েন না, অজুহাত তুলে দেবেন না অন্যদের হাতে। আমি জানি, আয়, মুনাফা কমে যাওয়া, ব্যবসায় মন্দা, পত্রিকার বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে যাওয়া গণমাধ্যমে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে যথেষ্ট। কিন্তু ভেবে দেখুন, এমন ভয়াবহ সংকটকালে যিনি চাকরি হারাবেন তিনি গণমাধ্যমে তো নয়ই, এই বাজারে আর কোন চাকরি পাবেন না। দূর ভবিষ্যতে কোথাও আদৌ চাকরি পাবেন কি-না তারও নিশ্চয়তা নেই।

হয়তো প্রথম আলো, ডেইলি স্টার আইন মোতাবেক সব দেনা পাওনা পরিশোধ করেই ছাঁটাই করবে। তবু ভাবুন, সেই টাকা ভেঙে চাকরি হারানো কর্মীরা কতদিন বসে বসে খেতে পারবে, পরিবার পালতে পারবে এই অনিশ্চিত সংকটকালে? আমরা এমনিতেই এই সংকটকালে দেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভাবুন, ঠিক তখন আপনাদেরই পত্রিকাকে বাজারে শীর্ষ স্থানে নিয়ে আসতে বছরের পর বছর জীবনের সবটুকু নিংড়ে দেয়া কর্মীরা ছাঁটাই হলে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য কী ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে পড়বে! তখন কে সামলাবে তাদেরকে? এই সংকটে ছাঁটাইয়ের আগে দয়া করে সবদিক বারবার ভাবুুুন।

এক্ষেত্রে নাম উল্লেখ না করে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একটি উদ্যোগের ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। তাদের অনেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী আছে। যাদের চাকুরি চুক্তি শেষে চলে যায়, কারণ ঐ কাজের বা প্রকল্পের তহবিল শেষ হয়ে যায়, ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষে তাদেরকে কোনভাবেই চাকরিতে যুক্ত রাখা সম্ভব হয় ন। চুক্তিভিত্তিক চাকরিজীবিরাও তা জানে, ফলে তারা চুক্তি শেষে কোথায় কী কাজ করবে খুঁজে ঠিক করে ফেলে।

সংকট বুঝে সেই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এবার ব্যতিক্রম ঘটাচ্ছে। তারা অনুধাবন করেছে, এই চুক্তিভিত্তিক চাকুরিজীবিরা চুক্তি শেষে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দায় কোথাও কোন কাজ বা চাকরি পাবে না। ফলে তাদেরকে চুক্তি শেষে বিদায় দিলে তাদের জীবন মহা বিপদে পরবে। আবার চুক্তি শেষে চাকরিতে রাখাও যাবেনা কারন তাদের বেতন দেবার কোন তহবিল থাকবে না। তারপরও সংস্থাটি চুক্তিভিত্তিক সেসব কর্মীদের এই মহা সংকটে চুক্তি শেষেও বের করে দেয়নি। তাদের আয় রোজগারের উপায় বের করেছে। তারা দেখেছে, তাদের বহু নিয়মিত খরচের খাতের টাকা বেঁচে যাচ্ছে করোনায় পরিবর্তিত জীবনে। যেমন, তাদের বহু কর্মীকে এখন ভ্রমণ করতে হবে না, তাদের হোটেলে থাকা খাওয়ার খরচ দিতে হবে না। সব কিছুই এখন বাসায় থেকে অনলাইনে করতে হবে, তা হোক সভা, সেমিনার, কনফারেন্স, প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন। তাই বহু খাতে খরচের টাকা বেঁচে যাচ্ছে। কিন্তু কাজ সবই হচ্ছে ঠিকঠাক। সেইসব বেঁচে যাওয়া খরচের টাকা থেকে মেয়াদ শেষ হবার পরও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চাকুরিতে রেখে বেতন দিচ্ছে, অন্য কাজে যুক্ত করে রাখছে তাদেরকে।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ এমন কিছু উপায় খুঁজে বের করুন, যেন ছাঁটাই না করে অন্তত করোনার দুঃসময়কাল পর্যন্ত সবাইকে চাকুরিতে রেখে পত্রিকা চালানো যায়। ছাঁটাই সহজ সমাধান ও সংকট মোকাবেলার সনাতন কৌশল। কিন্তু প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কাছে প্রত্যাশা- তারা ছাঁটাইয়ের কৌশল নয়, এই ভয়াবহ অনিশ্চিত সংকটে সবাইকে সাথে রেখে কাজ করার উপায় বের করবে। যা গণমাধ্যমের অন্য সবার জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

যা কিছু ভাল তার সাথেই যেন থাকে প্রথম আলো। (ফেসবুক থেকে)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best