ঢাকা, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ৭ মিনিট আগে
শিরোনাম

অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য বিভাগ

  ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:২৩  
আপডেট :
 ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৭

অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য বিভাগ

ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্য বিভাগ অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। লাইসেন্স নবায়ন হতে মিলের বরাদ্দ প্রাপ্তি এবং চুক্তির চাল সরবরাহ করতেও পদে পদে গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

এছাড়াও মিলের ন্যূনতম অবকাঠামো না থাকার পরও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে যাচ্ছেতাই ভাবে। এতে প্রকৃত মিল মালিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন পর্যাপ্ত বরাদ্দ হতে। আর দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এক মৌসুমে জেলা খাদ্য বিভাগ পৌনে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

চলতি বছর আমন মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলায় ২২ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এ জন্য জেলায় ১ হাজার ৭৮০টি হাসকিং মিলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় জেলা খাদ্য বিভাগ। এর মধ্যে অটো মিল ১৭টি এবং হাসকিং মিল ১ হাজার ৭৬৩ টি।

এসব মিলের মধ্যে সদর উপজেলার ৯৮টি হাসকিং মিল (ক্রমিক নং ৭৫২ হতে ৮৫০ পর্যন্ত) রয়েছে কালো তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ ওইসব হাসকিং মিল ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের আমন মৌসুমে সরকারের সঙ্গে চাল সরবরাহের চুক্তিবদ্ধ না হওয়ায় পরবর্তী ৪ মওসুমের জন্য তারা সরকারি খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহে অযোগ্য ঘোষিত হয় এবং তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত ৯৮টি হাসকিং মিল মালিককে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে এ বছর নতুনভাবে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। কিন্তু জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলছেন, চলতি অর্থ বছরে নতুন কোন মিলের ক্ষেত্রে তিনি একটিও নতুন লাইসেন্স ইস্যু করেন নি।

নতুনভাবে লাইসেন্স প্রাপ্তি এবং চালের বরাদ্দ পেতে প্রতিজন মিল মালিককে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা সেলামি দিতে হয় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায়কে। এতে ৯৮টি হাসকিং মিলের বিপরীতে ওই কর্মকর্তা ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এ নিয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এর মাঝে শুরু হয় টানাপোড়েন। ৯৮টি হাসকিং মিলের মালিক ব্যবসায়ীরা খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করেও সময়মতো বিল পরিশোধ করা হয়নি। দীর্ঘ এক মাস পর জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে চাল বিক্রির টাকা পরিশোধ করা হয় তাদের।

এ কারণে বিভাজনে ৯৮টি অবৈধ হাসকিং মিল তালিকাভুক্ত করায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল বরাদ্দ না পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন বলে জানান আমিনুল ইসলাম নামে একজন হাসকিং মিল মালিক।

অভিযোগ রয়েছে, হাসকিং মিলের যোগ্যতাবিহীন প্রায় ২ শতাধিক নামকাওয়াস্তে মিলের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রুহিয়া খাদ্য গুদামের আওতায় রায়হান হাসকিং মিল নামে একটি কাঠের স-মিল এবং শিবগন্ধ এলাকার একটি তেলমিলও বাদ পড়েনি।

এ ব্যাপারে ওই গুদামের কর্মকর্তা জাকারিয়া হোসেন স্বীকার করে বলেন, চলতি সংগ্রহ মৌসুম শুরুর পূর্বে প্রতিটি মিলের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে ১৫/১৬ টি অযোগ মিলের তালিকা টিসিএফ বরাবরে দাখিল করা হলেও বরাদ্দ বিভাজনের সময় সে তালিকা অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে কাঠের স-মিলটি আবারও বিভাজনভুক্ত হয় এবং সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করে।

চাল সরবরাহকারী হাসকিং মিল মালিকগণ অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান চালের বাজার এবং সরকারি গুদামে চালের দামে কেজি প্রতি ফারাক প্রায় ১০ টাকা। এই ১০ টাকার প্রায় ৬ টাকাই হাতিয়ে নিচ্ছেন টিসিএফ এবং গুদাম কর্মকর্তা সহ অন্যরা। এ কারণে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে আমন ধান বিক্রি করতে পারছে না।

এদিকে ঠাকুরগাঁও সদরে এ বছর থেকে টন প্রতি ২শো টাকা হারে অতিরিক্ত সেলামি আরোপ করেছে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে অধঃস্তন কর্মচারীদের মাধ্যমে তিনি দাপটের সঙ্গে ওই টাকা আদায় করেছেন। আর সদর উপজেলার বরাদ্দকৃত ১০,২১২ মেট্রিক টনে অবৈধভাবে আদায় করেন ২১ লাখ ২২ হাজার ৪শো টাকা। অবৈধভাবে আদায়কৃত প্রায় অর্ধ কোটি ( ৪৫ লাখ ৭২ হাজার ৪শ টাকা) দিয়ে তিনি বর্তমানে গাড়ি কেনার ইচ্ছা পোষণ করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (টিসিএফ) টাকা গ্রহণের কথা এড়িয়ে যান।

ব্যবসায়ীরা আরো অভিযোগ করেছেন, চাল নিয়ে যাওয়ার পর থেকে শুরু হয় অবৈধ টাকা গোনার পালা। খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা বস্তা প্রতি নির্ধারিত হারে বখশিস (পিসি) ছাড়া বিলে সই করেন না। সোটার করা চাল সরবরাহ করতে বস্তা প্রতি ৩০ টাকা, সোটারবিহীন ৬০ টাকা এবং পুরাতন চাল দিলে বস্তা প্রতি ১শো টাকা হারে পরিশোধ করতে হয়।

অন্যথায় বিনির্দেশের অজুহাতে নানাভাবে হয়রানি করা হয় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের। এ হিসেবে জেলায় মোট বরাদ্দের (৭ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৬ বস্তা) বিপরীতে গড় সেলামি ৩০ টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে ২ কোটি ২৪ লাখ ৯২ হাজার ৯৮০ টাকা। ওই টাকায় খাদ্য বিভাগের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর হিস্যা রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ হিসেবে শুধুমাত্র একটি সংগ্রহ মৌসুমে জেলা খাদ্য বিভাগ দুনীতি করছে ২ কোটি ৭০ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮০ টাকা।

গত ২০১৭ সালের বোরো সংগ্রহ মৌসুমে জেলায় চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৫ হাজার ৭৫৭ মেট্রিক টন। সে সময় হাসকিং মিলের সংখ্যা দেখানো হয় ১ হাজার ৬৩৮টি এবং অটো মিল ১৪টি। তার মধ্যে লাইসেন্স নবায়নকৃত ছিল ১ হাজার ৬৫২টি এবং কালো তালিকাভুক্ত ১৮০টি।

শুধু সদর উপজেলায় ওই মৌসুমে চাল সরবাহের জন্য বিভাজনকৃত মিল দেখানো হয় ৭৫৪টি অটো-হাসকিং মিল। অথচ তার পূর্বে আমন মৌসুমে সরকারের সঙ্গে চাল সরবরাহর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় ৪০৯টি হাসকিং ও অটো রাইস মিল। অবশিষ্ট ৩৪৫টি হাসকিং মিলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তাদের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে গত আমন মৌসুমে সরকার ব্যাপক চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নিলে জেলা খাদ্য বিভাগ রাতের আধারে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স প্রদান করে।

এদিকে চলতি আমন মৌসুমে জেলা খাদ্য বিভাগ অভ্যন্তরীন খাদ্য সংগ্রহ ডিসেম্বরের ১ তারিখ হতে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধার্য করলেও বরাদ্দের বেশির ভাগ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

চাল সংগ্রহ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দের চাল উত্তোলনে ডিও প্রতি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে ৫০০/- টাকা হারে সেলামি দিতে হয় বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিও কেনা একাধিক ব্যক্তি। এতে ওই কর্মকর্তার দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন এলাকার ব্যবসায়ীরা।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান রাজু বলেন, খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখতে পারছে না। সে কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় হাসকিং মিল সমূহ চালু রাখা যাচ্ছে না।

ঠাকুরগাঁও রোডের মিল মালিক মোবাবর আলী বলেন, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক টন প্রতি ৫শো টাকা দাবি করেছিল। পরবর্তীতে আমরা নেতারা বসে সিদ্ধান্ত দিই টন প্রতি ২শো টাকা করে টিসিএফকে দিতে হবে। সেই অনুযায়ী টিসিএফ টাকা তোলেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ বাবুল হোসেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায় তার বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বলেন, অফিস চালাতে ব্যাপক খরচ। তাই একটু এদিক সেদিক করতে হয়।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ বাবুল হোসেন টিসিএফের দুর্নীতির বিষয়গুলো ওয়াকিবহাল নন বলে জানান। তিনি জানান, এ বছর নতুন কোনো মিলের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি। কাজেই ৯৮টি নতুন মিলের বিপরীতে চাল বরাদ্দ ও সরবরাহের প্রশ্নই ওঠে না।

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত