এমপিও নীতিমালা ২০২৫: সংকটে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:০৫ আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:১২

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ জারির পর শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মফস্বল সাংবাদিক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। গত ৭ ডিসেম্বর জারি করা এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী একাধিক চাকরি কিংবা সাংবাদিকতা ও আইন পেশার মতো লাভজনক কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এ নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিল করার বিধান রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সারা দেশের শিক্ষক-সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নবগঠিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ সূত্রে জানা গেছে, নীতিমালাটিকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি চলছে। নতুন এই জনবল কাঠামো ও নীতিমালা শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পর সৃজনশীল বা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা কোনো অন্যায় নয়।
এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ এবং ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটির আহ্বায়ক এবং শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ হাসান বাদল গণমাধ্যমকে বলেন, “সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছেন। সাংবাদিকতা কোনো দ্বৈত পেশা নয়, এখান থেকে আমরা নামমাত্র সম্মানী পাই, যা বেতনভুক্ত চাকরির মতো নয়।”
শিক্ষকদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি বা কাজি হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকলেও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রশাসনের একটি অংশের ক্ষোভের প্রতিফলন। মাদারীপুরের শিক্ষক ও সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে প্রশ্ন করেন, “সরকারি চিকিৎসকরা দায়িত্ব শেষে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতে পারলে শিক্ষকদের সাংবাদিকতা কেন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে?”
অনেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকরা লেখালেখি বন্ধ করলে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকতার মান আরও নিচে নেমে যাবে। তাদের মতে, এই নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষকদের সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে।
নীতিমালা জারির পর মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান একটি আদেশের মাধ্যমে সাত উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তার আওতাধীন কতজন শিক্ষক সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় যুক্ত আছেন, সে সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাঠাতে। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এই তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক লাভজনক অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে পারবেন না এবং তথ্য যাচাই শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে সারাদেশে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী এমপিওভুক্ত রয়েছেন।
তদন্তে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সরকার এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময় সভায় বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারা প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। এর আগে ২০২৩ সালের ডিসি সম্মেলনেও শিক্ষকদের জন্য সরকারি কর্মচারীদের মতো আচরণবিধি প্রণয়নের প্রস্তাব ওঠে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে এ নীতিমালা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাংশ এটিকে শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক মনে করলেও অন্য পক্ষের মতে, এটি বৈষম্য ও অস্থিরতা তৈরি করবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী গণমাধ্যমকে বলেন, “নীতিমালায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় গণমাধ্যমকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম









