ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ১৫ মিনিট আগে
শিরোনাম

বাজেট অবাস্তবায়নযোগ্য, উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটের সহায়ক: জামায়াত

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৬, ১৬:০৬

বাজেট অবাস্তবায়নযোগ্য, উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটের সহায়ক: জামায়াত

বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অধিক ঋণনির্ভর ও উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়ন অযোগ্য ও লুটপাটের বাজেট’ আখ্যা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

বাজেট ঘোষণার পরদিন জামায়াতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অবিলম্বে এই উচ্চাভিলাষী ও লুটপাটনির্ভর বাজেট সংশোধন করে বিনিয়োগবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়নের জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করা বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে সরকারের এই সম্ভাব্য ব্যয় মেটাতে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে। তাতে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৫ শতাংশ।

মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, এই বাজেট ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর ‘নির্ভরশীল’। যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কীভাবে আদায় করা হবে তা ‘স্পষ্ট করা হয়নি’। ঘাটতি কোথা থেকে পূরণ করা হবে, তাও ‘স্পষ্ট নয়’। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে, সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন–সেগুলোর উল্লেখ নেই।

তিনি বলেন, বড় ঘাটতির বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবাকিভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে।

জামায়াত মনে করছে, এ বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি ‘বড় বাধা’ রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ‘অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে’ বলে জামায়াত মনে করছে।

জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের তুলনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি।

তিনি বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।

বাজেটে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং বৈষম্যমূলক নীতির কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে এডিপির আকার বৃদ্ধি করলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর কর বৃদ্ধি করায় শিল্প উৎপাদনে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ পড়বে বলে আশঙ্কা করছে জামায়াত।

দলটির ভাষ্য, পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আরএমজি তথা তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা এই গণবিরোধী বাজেটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য এবং সুদের বোঝায় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হয়েছে, প্রবৃদ্ধির গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এবং ঘাটতি বাজেট আরও বিস্তৃত হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে ঘাটতির হার ৩.৫ শতাংশ। কিন্তু এই ঘাটতির অর্থায়ন প্রক্রিয়া মোটেও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

এ বাজেটে সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট। প্রথমত, এনবিআরের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত কর প্রশাসন প্রয়োজন, যা এখনো গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সরকার কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি। তৃতীয়ত, ঋণ ব্যবস্থাপনা। দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের চাপ সামাল দেওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।

সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, আর জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বাস্তবায়ন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে বলে আমরা মনে করি, বলেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ জামায়াতের বাজেটে ঘাটতি অনেক কম, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ; সেখানে সরকারের ঘাটতি ৩.৫ শতাংশ। সরকারি বাজেট ও জামায়াতে ইসলামীর ছায়া বাজেটের মধ্যে পার্থক্য শুধু সংখ্যাগত নয়; অর্থনৈতিক দর্শন, নীতিগত অবস্থান এবং বাস্তবায়ন কৌশলেও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, আমাদের আমিরে জামায়াত অর্থবছর পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরভিত্তিক অর্থবছর চালু করা। জামায়াত আশা করছে, সরকার গঠনমূলক প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে বাজেট সংশোধন করবে এবং বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে যে নৈরাজ্য ও অনিয়মের লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করার দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইসলামী ব্যাংক নিয়েও কথা বলেন।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমীরে জামায়াত সংসদে তার বক্তব্যে দাবি করেছেন, যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। একইভাবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পরিবর্তন করে রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতারও আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।

জনগণের উদ্দেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আসুন, এই লুটপাটনির্ভর বাজেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। এটি জনবান্ধব নয়, উন্নয়নবান্ধব নয়; বরং গণবিরোধী বাজেট।

অন্যদের মধ্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত