ঢাকা, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ১৭ মিনিট আগে
শিরোনাম

তিন মাসের জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা তৈরির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ১৯:৫২

তিন মাসের জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা তৈরির সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

দেশে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ সক্ষমতা কমপক্ষে তিন মাসে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এছাড়া জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি।

রোববার (৭ জুন) ‘সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয়’ বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এদিন বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে, এই অধিবেশনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে।

বিএনপির নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে, সেখানে হামলা চালায় ইরান।

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহে সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে এপ্রিলে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয় ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি।

সংসদে উপস্থাপন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা এবং দেশের ভেতরে ‘প্যানিক বায়িং’, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।

জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ সম্প্রসারণ করে কমপক্ষে তিন মাসের সক্ষমতা গড়ে তোলার সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে দীর্ঘ সময়ের চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা না থাকায় আমদানি ব্যাহত হলেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।

এ বাস্তবতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) দ্রুত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জ্বালানি পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়েও সমীক্ষা চালানোর কথা বলা হয়েছে।

বিভিন্ন ভবনের ছাদে বাধ্যতামূলক সৌর প্যানেল স্থাপনের পাশাপাশি এসব ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে ‘সিস্টেম লস’ কমানো এবং তেল, গ্যাস, কয়লা, সৌর ও বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যদের ১০ দফা সুপারিশও যুক্ত করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সমীক্ষা পরিচালনা করা উচিত। সরকারের চাহিদার অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস তৈরি করা উচিত নয়। আপাতদৃষ্টিতে, বর্তমান সময়ে দেশে স্থাপিত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হলেও প্রকৃত চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সর্বোচ্চ উৎপাদন সাধারণত ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

বিরোধী দলের প্রস্তাবে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে গ্যাস কূপের ‘ওয়ার্কওভার’, দ্রুত ফলদায়ক কূপে বিনিয়োগ, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জ ক্ষেত্রের গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতেরও সুপারিশ করা হয়।

স্থলভাগ ও সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আকৃষ্ট করারও সুপারিশ করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা। সিলেটে অপরিশোধিত তেল আবিষ্কারের প্রসঙ্গ তুলে দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধান অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বিরোধী দলের সুপারিশে ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বর্তমান প্রায় ১ শতাংশ থেকে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীতের কথা বলা হয়েছে।

এ জন্য ছাদে সৌর বিদ্যুতের ‘নেট মিটারিং’ সম্প্রসারণ, ব্যাটারি স্টোরেজ যুক্ত করা এবং সৌর মডিউল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পার্বত্য এলাকায় ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই, নদীপ্রবাহভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, হাইড্রোজেন ফুয়েল, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মতো বিকল্প উৎস নিয়েও গবেষণার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের উপসংহারে কমিটি বলেছে, সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

কমিটির মতে, বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বহুমুখী জ্বালানি উৎস এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত